banner
bangla-bar

 

ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন –সিঙ্ঘু বর্ডার থেকে

সুমিত চৌধুরী

ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন কভার করতে নিজের উদ্যোগে দিল্লি আসবার জন্য আমার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বন্ধুরা অনেকেই উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন। সত্যি কথাটা হচ্ছে আমার এই অভিযানে আসা মূলত কয়েকজন বন্ধুর পীড়াপীড়িতে। আমি প্রথমেই হাত তুলে দিয়েছিলাম পয়সা নেই বলে।

চিকিৎসক বন্ধু গৌতম, ওর বউ মিতা, এমনকি পেনশন সম্বল বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ শুভেন্দু দা মানে শুভেন্দু দাস গুপ্ত রীতিমতো চাঁদা তুলে ফেললে আমাকে দিল্লি পাঠানোর জন্য। আমার বউ তনুশ্রীর উপার্জন সেলাই মেশিনে ঘাড় গুঁজে সেলাই করে বিনানের কুর্তি বানিয়ে। তনুশ্রীর কাছ থেকে পাওয়া কিছু টাকায় একটা নতুন মোবাইল এবং ব্লুটুথ যোগাড় হল।

কিন্তু দিল্লির এই প্রান্তরে এসে বুঝলাম আমার এইসব সাজগোজ একান্তই তুশচু। কারণ লড়াইয়ের যে বিপুল মহাকাব্য এখানে তৈরি হচ্ছে তাকে ক্যামেরায় ধরা প্রায় অসম্ভব। সাংবাদিকতার পাশাপাশি টিভি প্রোডাকশনের কাজ করেছি কয়েক বছর।কয়েক কোটি টাকার আন্তর্জাতিক রিয়েলিটি শোয়ের এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার ও ছিলাম। বাজি ফেলে বলতে পারি দিল্লির সীমান্তে ন্যাশনাল হাইওয়ের উপর ট্রলি পেতে , 3 ক্যামেরার সেটআপ বসিয়ে, জিপ লাগিয়ে এমনকি ড্রোন উড়িয়ে ও এই আন্দোলনের ব্যাপকতাকে ধরা যাবেনা। কারণ এই আন্দোলনের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে রয়েছে হিন্দি বলয়ে ভারতীয় কৃষক জনতার মননের গভীরে।

নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানের পর আর কোন কৃষক আন্দোলন এতটা প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। নকশাল আন্দোলনের শ্রেণীমেরুকরণে কৃষকদের যে সম্পন্ন অংশ শাসক শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের একটা বড় অংশ এবার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের শিবিরে। সব মিলিয়ে কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে সাইক্লোনের একটি অক্ষিবিন্দু তৈরি হয়েছে।

বহুদিন পর দোয়াব অঞ্চলের কৃষকরা দিল্লিতে হানা দিচ্ছে।

ভারতীয় কৃষক জনতার সংগ্রামের মুহূর্তে ভাইচারা বহু পুরনো। বাদশাহো জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দোয়াব অঞ্চলের কৃষকেরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বিদ্রোহ করে আগ্রায় সম্রাট আকবরের কবর থেকে হাড় তুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।

সিংঘু বর্ডারে দাঁড়িয়ে এক শিখ কৃষক নেতা সাফ সাফ বলে দিলেন, সরকার আন্দোলনের খালি ট্রেলার টুকু দেখেছে। বাকিটা পরে দেখবে।

দিল্লির সীমান্ত ঘিরে পরপর জমায়েত কার্যত কুম্ভ মেলা কেও হার মানাচ্ছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে ট্রাক্টর আর ম্যাটাডোরের লাইন। জাতীয় সড়কের দু'ধারে অসংখ্য তাঁবু। একের পর এক লঙ্গর। সেই লঙ্ঘরের জন্য গ্রামবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। পূণ্য লোভীরা‌যেভাবে ভান্ডারা চালান, সেইভাবে মহা পুণ্যের আশায় যেন মানুষ নিঃশেষেদান করতে চাইছেন এই মহাযজ্ঞে। তফাৎ একটাই পাপ-পুণ্যের লেনদেন থাকে পরজন্মে। এই মহা কুম্ভে যারা আহুতি দিতে আসছেন তারা যাবতীয় হিসাব এই জন্মে বুঝে নিতে চাইছেন।

সৎ শ্রী কাল ধ্বনির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ইনকিলাব জিন্দাবাদ। রাস্তায় রাস্তায় মিছিলে ঘনঘন আওয়াজ উঠছে, মোদি আম্বানি আদানির বিরুদ্ধে।

সব সময় যে কেন্দ্রীয়ভাবে মিছিল হচ্ছে এমন টা নয়। যে কোন গোষ্ঠীর যখন ইচ্ছে করছে, আওয়াজ তুলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে। বাকিরা তখন হয়তো মূল জমায়েতে অথবা রান্নাঘরে ।

মূল মঞ্চ গুলোতে বিভিন্ন গণসংগঠনের প্রতিনিধিরা আসছেন সারাদেশ থেকে।

সংগঠনের মূল নেতারা অনেকেই ব্যস্ত হরিয়ানা পাঞ্জাব উত্তর প্রদেশ জুড়ে একের পর এক মহা পঞ্চায়েত সংগঠিত করতে।মহা পঞ্চায়েতে যে বিপুল জনসমাবেশ হচ্ছে বলে খবর আসছে তাতে মোদির জন্য অশনিসংকেত অপেক্ষা করছে বলেই ধারণা।

আন্দোলনের নেতা থেকে সাধারণ কর্মী সবাই এক বাক্যে বলছেন, এই আন্দোলন জন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত মহিলারা এগিয়ে এসে মাসের-পর-মাস রুটি বেলছেন গণ রান্না ঘরে।

একের পর এক লাইব্রেরী গড়ে উঠেছে হাইওয়ের ধারে। কেউ এসে বিনা পয়সায় কমলালেবু বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।যে জুতো সারাতে জানে মিছিলে আসা কৃষকদের ছিড়ে যাওয়া জুতো সারিয়ে দিচ্ছে বিনা পয়সায়।যে প্রান্তিক গরীব মানুষটির কিছুই দেয়ার ক্ষমতা নেই, সেই মানুষটিও বন জঙ্গলে ঘুরে কাঠকুটো জড়ো করে আনছে গন রান্নাঘরের জন্য।

আশ্চর্য এক সংযম গোটা আন্দোলন জুড়ে। বিনা পয়সায় পাওয়া যাচ্ছে বলেই বেশি করে খেয়ে নিতে হবে, মা পারি নিয়ে নিতে হবে এরকম কোন মানসিকতা কোথাও দেখলাম না।

টিকলি এবং সিংঘু বর্ডারে কত জায়গা থেকে যে আন্দোলনকারীরা খেয়ে যেতে বললেন তার ইয়ত্তা নেই।

কর্পোরেট মলের পাল্টা কিষান মল চলছে যেখানে বিনা পয়সায় আন্দোলনকারী কৃষকদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেয়া হচ্ছে। সুশৃংখল লাইন। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই।

আশেপাশের মানুষজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনায়াসে। সিংঘু বর্ডারে দেখলাম, স্থানীয়KFC প্লাজার মালিক মল আন্দোলনকারীদের ব্যবহারের জন্য খুলে দিয়েছেন।বিদেশে বসবাসকারী শিখরা ঢালাও সাহায্য করছেন আন্দোলনকারীদের।

একাধিক মেডিকেল ক্যাম্পে দেখা হল পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া বিভিন্ন ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে। স্থানীয় ডাক্তার প্রেম বললেন আমার ডাক্তার-খানা আন্দোলনকারীদের জন্য 24 ঘণ্টা খোলা। কারণ আমি নিজে একজন কৃষক পরিবারের সন্তান।

কৃষি এবং কৃষক এর সঙ্গে হিন্দি বলয়ের সমাজের যে ভাইচারা তা এই আন্দোলনকে বিপুলভাবে শক্তি যোগাচ্ছে।মনে রাখতে হবে দিল্লির সীমান্তে যে সমাবেশ দেখা যাচ্ছে তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র।

পাঞ্জাব হরিয়ানা রাজস্থান উত্তর প্রদেশ যে বিশাল বিশাল মাপের মহা পঞ্চায়েত হচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া বুঝতে মোদির সাহস যদি ভুল করে তাহলে তার জন্য বড় মাশুল দিতে হবে।

(facebook/12 february 2021)

Back to Home Page

Frontier
Feb 12, 2021


Your Comment if any