banner
bangla-bar

 

কেন্দ্রের নয়া তিন কৃষি আইন জনবিরোধী কেন

কিসান একতা মোর্চা

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১। কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দিল্লির উপকণ্ঠে ৭২দিনে পা দিল কৃষক আন্দোলন৷ এই দিনই কৃষিমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র সিং তোমর রাজ্যসভায় মিথ্যের ফুলঝুরি ফোটালেন। তিনি বললেন, প্রতিবাদী কৃষকরা কেন্দ্রের নয়া তিন কৃষি আইনগুলোতে একটাও খুঁত তাঁকে দেখাতে পারেনি। শুধু শুধু গোঁ ধরে বসে আছেন কৃষকরা এবং তাঁদের একটাই রা—এই তিন আইন প্রত্যাহার করতে হবে। এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর হয়না। ৩ ডিসেম্বর বিজ্ঞান ভবনে যে বৈঠক কৃষক আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে সরকারের হয়েছিল, সেখানে কৃষক নেতারা লাইন ধরে ধরে এই আইনগুলোতে গলদ কোথায় তা তাঁকে বলেছিল। ওই সময়ে না তিনি না তাঁর আধিকারিকরা কোনো উত্তর দিতে পেরেছিলেন। তা সত্ত্বেও এত বড় মিথ্যা বলতে তাঁর আটকালো না।

আমরা এখানে আবার তাঁকে এই আইনে ভুলটা আসলে কোথায়, তা বলতে চাই। কেন এই তিন কৃষি আইন শুধু কৃষক বিরোধীই নয়, জনবিরোধীও, তা তাঁকে ধরিয়ে দিতে চাই।

আইনগুলোর ভিতেই রয়েছে গলদ
গোটা বিশ্বের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে ফসল কেনা বেচায় যখন সরকারের ভূমিকা কমে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে তখন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে কৃষকের উপর শোষণও। এই নীতিগুলোই, যাকে খোলা বাজারের নীতি বলা হয়, দু-তিন দশক আগে পশ্চিমী দেশগুলোতে আনা হয়েছিল। এই নীতিগুলোর প্রয়োগের আগে আমেরিকায় কৃষকরা ফসলের রিটেল প্রাইসের ৪০ শতাংশ পেত। অর্থাৎ, খোলা বাজারে কৃষিজাত কোনো পণ্য যদি ১০০ টাকায় বিক্রি হত তবে কৃষক পেত ৪০ টাকা। কিন্তু যখন থেকে এই ধরনের নীতি চালু হল, কৃষকরা ফসলের রিটেল প্রাইসের মাত্র ১৫ শতাংশ পেতে শুরু করল। বাকি ২৫ শতাংশ চলে গেল বড় বড় কোম্পানির পকেটে।

ব্রিটেনে দুধ কেনা বেচা নিয়ে যে সরকারী বোর্ড ছিল, তা ১৯৯৩ সালে তুলে দিয়ে গোটা ব্যবস্থার বেসরকারীকরণ করা হল। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৩২ হাজার ছোট ডেয়ারি ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে। দুধের ফার্মগুলো তো উঠে গেল, অথচ আশ্চর্যরকমভাবে দুধের উৎপাদন বেড়ে গেল। কীভাবে এটা সম্ভব হল? বড় বড় কোম্পানির বড় বড় ডেয়ারি ফার্ম খুলে গেল আর ছোট ছোট ডেয়ারি ফার্মগুলো পুরো বরবাদ হয়ে গেল।

আমাদেরই দেশের  বিহারে ২০০৬ সালে  ‘কৃষিপণ্য বাজার কমিটি’ অর্থাৎ এপিএমসি (APMC) সিসটেম তুলে দেওয়া হল। ওই সময় বিহার সরকার খুব জোর প্রচার করেছিল যে বেসরকারী প্রাইভেট ক্ষেত্রগুলি প্রচুর লগ্নী করবে এবং কৃষকরা মালামাল হয়ে উঠবে। আজ বিহারে কৃষকরা কী অবস্থায় রয়েছে? ভুট্টা বিহারের অন্যতম মূল চাষ। ভুট্টার সরকারি রেট অর্থাৎ ন্যূনতম সমর্থন মূল্য (MSP) ১৮৫০ টাকা প্রতি কুইন্টাল। অথচ ভুট্টার ব্যাপারীরা কিনছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কুইন্টাল। লগ্নী করা টাকাও ফেরৎ পাচ্ছেন না কৃষকেরা। এরই ফলে আমরা দেখছি ভারতের প্রায় সমস্ত রাজ্যে গিয়ে বিহারের কৃষকরা গতর খাটিয়ে রোজগার করতে বাধ্য হচ্ছেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারি, আসাম থেকে গুজরাট, যেখানেই যান না কেন, আপনি বিহারের শ্রমিকভাই-এর দেখা পাবেনই। তাঁদেরকে প্রশ্ন করলে জানবেন যে তাঁদের কাছে রয়েছে তিন থেকে চার একর জমি। অথচ এত জমি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অন্য রাজ্যে মজুরি করতে যান কেন? উত্তর একটাই। বিহারে ফসলের ক্রয় ব্যবস্থা (procurement system) নেই। ফসল অর্ধেকেরও কম দামে বেচতে হয় কৃষকদের। ব্যাপারীরা কৃষকের শোষণ করে। কৃষি বিল সংসদে পেশ হওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন যে এই আইন বিহারে লাগু হয়েছিল এবং যার ফলে কৃষকরা বহুল পরিমানে উপকৃত হয়েছিল।  বন্ধুরা, আপনারাই বলুন, ভুট্টার ন্যূনতম সমর্থন মূল্য যখন  ১৮৫০ টাকা প্রতি কুইন্টাল, অথচ কৃষকরা ৫০০-৬০০ টাকায় বেচতে বাধ্য হচ্ছেন—এটা উন্নতি না বরবাদী।

মাননীয় কৃষিমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র সিং তোমর, আপনার রাজ্য মধ্যপ্রদেশের দিকে ফিরে তাকানো যাক। ৫ জুন, ২০২০ তে, যখন থেকে অধ্যাদেশ এনে কৃষি বিল কৃষকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন থেকে আজ পর্যন্ত, এই ছ’মাসে মধ্যপ্রদেশের সরকারী মান্ডিগুলোকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রদেশে কৃষি মান্ডির সংখ্যা ছিল ২৬৮।  এরই মধ্যে ৪৭ মান্ডি পুরোপুরি লোপ পেয়েছে। ১৪৩ মান্ডিগুলোতে কেনাবেচা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এই সময়েই অর্ধেকেরও কম দামে কৃষকরা তাঁদের ফসল বেচতে বাধ্য হচ্ছে। অপরদিকে মধ্যপ্রদেশের ১৯৭২-এর মান্ডি আইন একটি কৃষকমুখী আইন হিসাবে মনে করা হত। ২০১৯ সালে এই ছ’মাসে কর বা ট্যাক্স বাবদ সংগ্রহ হয়েছিল ৬০০ কোটি টাকা। ২০২০ সালে এর পরিমান দ্রুত নেমে এসে দাঁড়ায় মাত্র ২২০ কোটি টাকায়। খেয়ালে রাখবেন, এই কর কিন্তু দিতে হয় ব্যাপারীদের। অবস্থা এখন এমন যে মান্ডির কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছে না সরকার।

এখানে বিষয়টাকে একটু গভীরে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে। নতুন কৃষি আইনের ফলে যে প্রাইভেট মান্ডিগুলো গজিয়ে উঠবে, তা সরকারও অস্বীকার করে না। বস্তুত প্রাইভেট মান্ডিগুলোর বাড় বাড়ন্তই তো নতুন আইনের অন্যতম দিক।  প্রাইভেট মান্ডিগুলোর আসার ফলে সরকারী মান্ডিগুলো যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। প্রাইভেট মান্ডিগুলোতে ব্যাপারীদের কোনো রকম কর দিতে হবে না, এমনকি কৃষিজাত পণ্য কিনতে কোনোরকম লাইসেন্সও লাগবেনা। শুধুমাত্র প্যান কার্ড দেখিয়ে যে কেউ কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কিনে নিতে পারবে। ইতিমধ্যেই শুধুমাত্র প্যান কার্ড দেখিয়ে কোনো পয়সা না দিয়ে ফসল নিয়ে পগার পার হয়েছে এর সংখ্যাও রীতিমত চিন্তাজনক। কৃষিমন্ত্রীর খোদ নিজের রাজ্য মধ্যপ্রদেশে এর সংখ্যা ভীতিপ্রদ। কৃষকদের ফাঁকি দিয়ে কেউ কেউ ১০ কোটি টাকার ফসল, কেউ কেউ ৫ কোটি টাকার ফসল  নিয়ে পালিয়ে গেছে। কৃষিমন্ত্রী, আপনি তো বলেছিলেন, ৩০ দিনের মধ্যেই এরা ধরা পড়বে। তিন-চার মাস কেটে গেল, কই একজনও তো ধরা পড়ল না।

এই সম্ভাবনা কে পুরোটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে হয়তো প্রথমদিকে বাইরের ব্যাপারীরা এমএসপি থেকে দশ-পনেরো টাকা বেশি দিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কিনবে। কিন্তু দু-তিন বছর বাদে আডানি-আম্বানিদের মতো হাতে গোনা ব্যাপারীদের হাতে একচেটিয়া দখল চলে আসবে, পুরো দাদাগিরি চলে আসবে, সমস্ত ব্যাপারে একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েম হবে। ততদিনে সরকারী মান্ডিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তখন এই ব্যাপারীরা জলের দামে ফসল কিনবে আর প্রচণ্ড চরা দামে দেশ-বিদেশে বেচবে। এমনকি এই কৃষকদের নিজেদেরই উৎপন্ন ফসল বাজার থেকে কিনতে হবে চরা দামে।

এইভাবেই মান্ডি আইন তৈরি হওয়ার আগে কৃষকদের উপর, সাধারণ মানুষদের উপর দুর্বিসহ নির্যাতন হত। কৃষক ফসল বেচার সময় ব্যাপারীরা অসাধু জোট তৈরি করে খুব সস্তায় ফসল কিনে গোদামে গোদামে ভড়ে রাখত এবং সুযোগ বুঝে চরা দামে বিক্রি করত। শোষণের শিকার একদিকে যেমন কৃষক জলের দামে বেচার কারণে হত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত চরা দামে কেনার কারণে হত। এই নির্যাতন বন্ধ করার লক্ষ্যেই দীনবন্ধু ছোটুরামের উদ্যোগে দেশে মান্ডি আইন চালু হয়।

নয়া কৃষি আইনে এমএসপি-র উল্লেখ নেই
এপিএমসি আইন অর্থাৎ মান্ডি আইনের আওতায় রাজ্য সরকারগুলোর এই দায়িত্ব বর্তায় যে কৃষিজাত পণ্য যাতে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সমর্থন মূল্যে কেনা হয়। কিন্তু নয়া কৃষি আইনে কোথাও ন্যূনতম সমর্থন মূল্য বা এমএসপি-র কোনো উল্লেখ নেই। সরকার নিজের কাঁধ থেকে এমএসপি-র গুরুদায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। কৃষিপণ্যের কেনা-বেচা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবদিহি থেকে পালাচ্ছে।

২০১৮ সালে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে অন্নদাতা কিষান সমিতি মধ্যপ্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। এই মামলার রায়ে কোর্ট খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে ১৯৭২ এর মান্ডি আইন অনুযায়ি এটা আবশ্যক যে মান্ডিতে ফসলের নিলামে প্রথম যে দাম হাঁকা হবে তা যেন এমএসপি-র কম না হয়। অর্থাৎ মান্ডি আইন কৃষকদের এই অধিকার দেয় যে তাঁদের ফসল ন্যূনতম সমর্থন মূল্যের চেয়ে কমে যাতে বিক্রি না হয়। কিন্তু নয়া কৃষি আইনে কৃষকরা এই অধিকার হারিয়ে ফেলল। এই কারণেই এই আইন কৃষক বিরোধী।

হুড়োহুড়ি করে এই আইন আনতে হল কেন?
সরকার বলছে যে “আমরা কৃষকের ভালোর জন্য এই আইন এনেছি।” ভালো কথা। তাহলে লুকিয়ে চুরিয়ে আনতে হল কেন? মহামারির সময়, লকডাউনের সময় আনতে হল কেন? অধ্যাদেশ জারি করেই বা আনতে হল কেন? আইন পাশ করানোর জন্য এত হুড়োহুড়িই বা করতে হল কেন? বিগত কুড়ি-পঁচিশ বা পঞ্চাশ বছরে কোনো একটি কৃষক সংগঠনও কি এই দাবিগুলো করেছিল?   

নয়া কৃষি আইন নিয়ে টিভিতে এক বিতর্কে বিজেপি-র এক মুখপাত্র বলেন যে এই আইন বানানোর আগে সরকার ৯৩ লক্ষ কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এর সত্যতা জানতে এক ভদ্রলোক আরটিআই (তথ্য জানার অধিকার আইন) করেন। উত্তরে তিনি জানলেন যে এইরকম কোনো তথ্যই সরকারের কাছে নেই। সোজা ভাষায় এর মানে হল এই আইন বানানোর আগে সরকার কারোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি।

নয়া আইনে ই-মার্কেটিং-এ সমস্যা
নয়া আইনে ই-মার্কেটিংকে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে, বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই দাবিও করা হয়েছে যে এতে ফোড়ে বা দালাল রাজের অবসান হবে। মন্ত্রী মশাই, আমাদের দয়া করে বুঝিয়ে বলুন, সরকারের কাছে কী এমন ব্যবস্থা রয়েছে যাতে ই-মার্কেটিং-য়ের আওতায় আসা কৃষি পণ্যের বাস্তবিক ডেলীভারি করা যাবে, অর্থাৎ খরিদ্দার নিজের গোদামে বা দোকানে বাস্তবিক অর্থে মাল তুলবে? ই-মার্কেটিং-এ এযাবৎ যা অভিজ্ঞতা আমাদের, তাতে দেখা গেছে কোনো একজন কৃষকের ফসল কেনে কিন্তু সে ফসলের বাস্তবিক ডেলীভারি নেয় না। সে নিজের কমিশন নিয়ে অন্য কাউকে ফসল বিক্রি করে দেয়। এইভাবে দ্বিতীয় জন নিজের কমিশন নিয়ে আরেকজনকে ফসল বিক্রি করে দেয়। এইভাবে দশ-বারো হাত ঘুরে যখন ফসল সাধারণের কাছে মুদির দোকান মারফত পৌঁছয়, তখন তাকে অনেক বেশি দাম দিয়ে সেটা কিনতে হয়। কৃষক পায় যৎসামান্য মূল্য আর সাধারণের পকেট ফাঁকা হয়।

কৃষকরা সিভিল কোর্ট যেতে পারবে না
নয়া কৃষি আইনে সরকার কৃষকদের সিভিল কোর্ট যাওয়ার অধিকার কেড়ে নিল। মন্ত্রী মশাই, দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা লড়াই করেছিলেন, যাঁরা নিজেদের প্রাণ দিয়েছিলেন, সে তো এই কারণেই যাতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার পায়, মৌলিক অধিকার পায়। এর জের ধরেই তো আমাদের সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু কেন জানি না, মোদী সরকার যখনই কৃষি নিয়ে কোনো আইন তৈরি করে, তখনই এমন একটি ধারাও যোগ করে যেখানে লেখা থাকে—কৃষকরা সিভিল কোর্ট যেতে পারবে না। আমরা ২০১৪-র ভূমি অধিগ্রহণ অধ্যাদেশ ভুলে যাইনি যা মোদী সরকার জবরদস্তি কৃষকদের উপর চাপাতে চেয়েছিল। ভাগ্য ভালো, সেই সময়েও দেশের কৃষকরা একজুট হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল যার ফলে সরকারকে এই অধ্যাদেশ ফেরৎ নিতে হয়েছিল। এই অধ্যাদেশেও সরকার লিখেছিল— অধিগ্রহণ নিয়ে কোনো কৃষক সিভিল কোর্ট যেতে পারবে না। নয়া কৃষি আইনেও সেই একই কথা রয়েছে— কৃষক সিভিল কোর্ট যেতে পারবে না। কৃষকরা কেবল এসডিএম বা জেলা আধিকারিকের কাছে যেতে পারবে। এসডিএম বা ডিএম তো সরকারেরই অংশ আর এরা প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেতাদের অধীনেই থাকে। আর রাজনৈতিক নেতারা ব্যাপারীদের চাপে থাকে। ভোটের সময় ব্যাপারীরা রাজনৈতিক নেতাদের টাকার জোগান দেয়। ভোটে জিতে নেতারা ব্যাপারীদের সাহায্য করে। কিন্তু আদালতের বিচার ব্যবস্থা সরকার থেকে আলাদা একটি স্বাধীন ব্যবস্থা। অন্তত খাতায় কলমে বিচার ব্যবস্থা কোনো সরকারের অধীনে নেই। বিচার ব্যবস্থা একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। অথচ নয়া কৃষি আইন কৃষকদের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

মজুতদারী ও কালোবাজারি অনুমতি আইন
নয়া কৃষি আইনে ১৯৫৫ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের সংশোধনী আনা হয়েছে। ১৯৫৫ সাল থেকে চলে আসা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনে মজুতদারী ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কিছু বিধি নিষেধ ছিল। কিছু কিছু জিনিস প্রয়োজনের চাইতে বেশি মজুত করা যেত না যাতে ওই জিনিসের দাম না বাড়ে। নয়া আইন মজুতের ওপর বিধি নিষেধ পুরোপুরি তুলে দিল। অর্থাৎ যে কোনো ব্যাপারী যত ইচ্ছা চাল, গম, আলু, ডাল, তেল, তিলের মতো কৃষিপণ্য কিনে মজুত করতে পারবে। এই মজুত করার প্রতিযোগিতায়ও বাড়-বাড়ন্ত হবে তাদেরই যাদের হাতে পয়সা আছে আর পিঠে রয়েছে সরকারের হাত। ঠিকই ধরেছেন, আডানি আম্বানিদের কথাই বলা হয়েছে। এর ফল কী দাঁড়াবে? কৃষক যখন ফসল নিয়ে মান্ডিতে পৌঁছবে, তখন ফসলের দাম কম থাকবে। আবার কৃষকের ফসল শেষ হয়ে গেলে দাম বাড়বে। ব্যাপারীর পকেটে মুনাফা ঢোকার চিরাচরিত খেলায় এবার থেকে নয়া আইনের বলে ব্যাপারীর পকেট মুনাফায় স্ফীত হবে আরো বেশি দ্রুত গতিতে।

নয়া আইনের শুধু এই দিকটি বিবেচনা করলে কৃষকদের থেকে বেশি বিপন্ন হবে অকৃষকবন্ধুরা। কৃষকেরা নিজের ফসল ফলিয়ে কোনোরকম দুবেলা খেয়ে পড়ে দিনগুজরান করে ফেলবে হয়তো। কিন্তু অকৃষকবন্ধুদের কী হবে? ইতিমধ্যে প্রকৃতির দান জলকে বোতলবন্দী করে লিটার পিছু ২০-২৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখে চোখ সয়ে গেছে আমাদের। যখন খাদ্যশস্য কোম্পানিদের কন্ট্রোলে চলে আসবে, তখন আপামর জনসাধারণকে চাল কিনতে হবে ৫০০ টাকা কিলো, ৬০০ টাকা কিলো। খাদ্যশস্যের অবাধে মজুত করার খোলা ছুট যে আসলে বড়ো কোম্পানিদের স্বার্থে করা হয়েছে, তা দিনের আলোর মতো পরিস্কার। তাই আজ কৃষকের লড়াই শুধুমাত্র কৃষকের লড়াই নয়, সমস্ত ভারতবাসীর লড়াই।

কোম্পানি-কৃষক চুক্তি আইন কৃষক-বিরোধী
নয়া কৃষি আইনের কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর দিক নিয়ে দু’এক কথা বলা যাক। এখানে আইনে বলা হয়েছে কোনো ব্যাপারী কৃষকের সঙ্গে চুক্তি করে তাঁর জমি কয়েক বছরের জন্য নিয়ে নিতে পারবে। এই জমিতে সেই ব্যাপারী গোদাম, কোল্ড স্টোরেজের মতো কাঠামো তৈরি করতে পারবে। রাজ্য সরকার বা কেন্দ্র সরকারের আওতাভুক্ত ক্রেডিট স্কীমের প্রকল্প থেকে সেই ব্যাপারী লোন নিতে পারবে। বন্ধুরা, এখানে একটা বিষয় গভীরভাবে দেখা দরকার। ক্রেডিট স্কীমের প্রকল্প থেকে লোন নিতে গেলে কোনো বস্তু বা জিনিস বা জমিকে জামানতে রাখতে হবে। জামানত না রেখে লোন তো শুধু কর্পোরেটদের জন্য। আডানি-আম্বানিদের মতো কয়েকজন লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার লোন নিয়ে বসে আছে। নীরব মোদী, বিজয় মাল্যদের মতো কয়েকজন তো আবার লোন নিয়ে ফুরুৎ করে পালিয়ে গেছে, কেউ ধরতেও পারেনি। যাহোক, প্রসঙ্গে ফেরা যাক। এক্ষেত্রে ব্যাপারী লোন নেবে চুক্তিবদ্ধ জমিকে জামানতে রেখে। চুক্তি শেষ হওয়ার পর ব্যাপারী তো কেটে পড়বে, লোন এসে চাপবে কৃষকের ঘাড়ে। একদিকে গোদাম, কোল্ড স্টোরেজের মতো কাঠামোর তলায় চাপা পড়া জমি চাষের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে আর অন্যদিকে ঘাড় চাপলো ভারী ঋণের বোঝা।

মন্ত্রীমশাই বুঝেও না বোঝার ভান করবেন না
মাননীয় কৃষিমন্ত্রীমশাই, এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পেরেছেন, কেন নয়া তিন কৃষি আইন কৃষক বিরোধী; কেবল কৃষক বিরোধীই নয়, জনবিরোধীও। এই কারণেই আমাদের দাবী, অবিলম্বে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করুন।    

এমএসপি-র আইনি গ্যারান্টি চাই
আমাদের দ্বিতীয় দাবী এমএসপি-র গ্যারান্টি দেবে এমন আইন আনতে হবে। ২০১১ সালের কথা। শ্রী নরেন্দ্র মোদী তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। সেই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-কে একটি রিপোর্ট পাঠান। এই রিপোর্টে তিনি দাবী করেছিলেন যে কৃষকদের জন্য এমএসপি-র আইনি গ্যারান্টি অত্যন্ত জরুরি। শুধু এমএসপি-র ঘোষণা করে দিলে কাজ হবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহাশয়, যার সুপারিশ আপনি খোদ ২০১১ সালে করেছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি থেকে প্রধানমন্ত্রীর গদী পাওয়া মাত্র মুখ ফিরিয়ে নিলেন কীভাবে? যেভাবে আপনি স্বামীনাথন রিপোর্টের সুপারিশ লাগু করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন না, একই ভাবে এমএসপি-র আইনি গ্যারান্টি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকেও পালালেন। OECD[1] এবং ICRIER [2] এর রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে উচিৎ এমএসপি না পাওয়ায় গত ১৭ বছরে দেশের কৃষকরা ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার লোকসান ভোগ করেছে। NABARD[3]-এর রিপোর্টে দেখা যায়, দেশের মোট কৃষকদের ৫২ শতাংশের উপর ঋণ রয়েছে এবং এর পরিমান ৯-১০ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ কৃষকদের দেয় টাকা হল ৯-১০ লক্ষ কোটি টাকা, আর সরকারের কাছ থেকে কৃষকরা যে টাকা পায় তার পরিমান হল ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা। সোজা কথায়, লেনদেনের হিসাব চুকিয়ে ফেললে কৃষকরা বকেয়া বাবদ ৩৫-৩৬ লক্ষ কোটি টাকা পায়।

মিটিং-এ সরকারের সঙ্গে কৃষক আন্দোলনের নেতাদের এমএসপি-র আইনি গ্যারান্টি দেওয়া নিয়ে যখন কথা হয়েছিল, তখন সরকার আর্থিক ক্ষতির দোহাই দিয়েছিল। সরকারের আর্থিক ক্ষতি হবে কেন? মোট ১৭ লক্ষ কোটি টাকার হল কৃষিপণ্যের বাজার। ১৪ লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা তো এখন চলছেই। যদি সরকার এমএসপি গ্যারান্টি আইন আনে, তাহলে প্রতিবছর সরকারের দরকার মাত্র ৩ লক্ষ কোটি টাকার। কৃষিপণ্য তো এমনি পণ্য যা বিক্রি হবেই। এমন তো নিশ্চয়ই হবে না যে সরকার কৃষকদের থেকে কৃষিপণ্য কিনবে আর সমুদ্রে ফেলে দেবে। সরকার তো এই কৃষিপণ্য আবার বিক্রি করবেই। তাই সরকারও লাভের মুখ দেখবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই ৩ লক্ষ কোটি টাকা আসবে কোথা থেকে? প্রতি বছর আমাদের দেশ ৯০ হাজার কোটি টাকার ভোজ্য তেল আমদানি করে। এই আমদানি ব্যবসায় যার নাম সবার উপরে তার নাম গৌতম আডানি। প্রতি লিটার ভোজ্য তেল আমদানিতে এই ব্যক্তির লাভ ৫ থেকে ১০ টাকা। অবাক ব্যাপার এটাই যে কেন্দ্রে সরকার যারই থাকুক, শুধু এই ব্যক্তির লাভের খাতিরে প্রতি বছর ৯০ হাজার কোটি টাকার ভোজ্য তেল আমদানি হয়ে আসছে।

৮০ হাজার কোটি টাকার ডাল অন্য দেশ থেকে এখানে চলে আসে প্রতি বছর। ২০১৮-১৯ সালে, ভারত ২৫৩ লক্ষ কুইন্টাল ডাল আমদানি করেছে। মোজাম্বিকে[4] ডালের আমদানি নিয়ে যখন এগ্রিমেন্ট হচ্ছিল তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে ডাল উৎপাদনের জন্য সরকার তাদের সবধরনের যন্ত্রপাতি দেবে, বীজ ইত্যাদি দেবে এবং উৎপাদিত ডাল কিনে নেবে। যদি আমাদের সরকার এই গ্যারান্টি আমাদের কৃষকদের দেয় যে তারা ভোজ্য তেলের জন্য প্রয়োজনীয় ফসল ফলাক, ডালের ফসল করুক, এবং সরকার তা কিনে নেবে, তাহলে সরকারের ৯০ হাজার কোটি টাকা + ৮০ হাজার কোটি টাকা বেচে যাবে, অর্থাৎ শুধু এই বাবদে ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকা বেচে যাবে। গুরো দুধ আমদানি বন্ধ করে সরকার যদি এখানে দুধের ভালো দাম দেয়, তাহলে সরকার অনেক সঞ্চয় করতে পারবে। গত বছর ৫ লক্ষ টন ভুট্টা আমদানি করেছিল সরকার, সেটা বন্ধ করে দিক। এইভাবে এমনিই ৩ লক্ষ কোটি টাকা চলে আসবে।

প্রধানমন্ত্রীজি, আপনি তো আত্মনির্ভর ভারত বানানোর কথা খুব বলেন। যদি আমদানি বন্ধ করে এমএসপি-র আইনি গ্যারান্টি দেবেন, তবে সত্যিকার অর্থে ভারত আত্মনির্ভর হবে। কেবল জুমলাবাজি করে, বয়ানবাজি করে আত্মনির্ভর ভারত বানানো যায় না।

প্রধানমন্ত্রীজি, এমন মনে হয় যে আপনার সরকারের নীতি এবং নিয়ত দুটোতেই খুঁত আছে। এটা এই কারণেই বলা যায় যে ২০১৭-১৮-এর পর থেকে সরকার এফসিআই (FCI)[5] কে কোন অর্থ বরাদ্দ করেনি। খাদ্যে ভর্তুকি বাবদ যে অর্থ বরাদ্দ থাকত, তা আপনি বন্ধ করে দিয়েছেন। যবে থেকে আপনার সরকার এসছে, এফসিআই-এর উপর ঋণের বোঝা ৪ গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। প্রতি বছর NSSF[6] থেকে ঋণ নিতে এফসিআই বাধ্য হয়। আজ এফসিআই-এর উপর ঋণের বোঝা এসে দাঁড়িয়েছে সোয়া থেকে সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকা, যা ২০১৪ সালের আগে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা হত। আপনাকে এই কথা এই কারণেই বললাম যে আপনি একটা ভিত তৈরি করছেন যাতে এফসিআই বেচে দেওয়া যায়। আপনি এয়ারপোর্ট বেচেছেন, এয়ারলাইন্‌স বেচেছেন, অনেকগুলো সরকারি সংস্থা বেচেছন। বেচার আগে এমন একটি আবহ তৈরি করেছেন যে এই সংস্থাগুলো লোকসানে চলছে। যখন এফসিআই-ই বেচে দেবেন, তখন মান্ডিতে ফসলের ক্রয় হবে কীভাবে? এই কারণেই, প্রধানমন্ত্রীজি, আমাদের মনে হয়, আপনার নীতি এবং নিয়ত দুটোতেই খুঁত রয়েছে, দুটোই প্রবলভাবে দেশবিরোধী।

দীনবন্ধু ছোটুরামজি একটি কথা প্রায়ই বলতেন—হে বুঢ়ে কিষান, দুশমন লে পেহচান, বোলনা লে শিখ।

কিসান একতা মোর্চা

অভিমন্যু


1. The Organisation for Economic Co-operation and Development

2. Indian Council for Research on International Economic Relations

3. National Bank for Agriculture and Rural Development

4. পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। ২০১৫ সালে মোজাম্বিকের সাথে ভারত পাঁচ বছরের মেয়াদের চুক্তি করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ি বেসরকারী কোম্পানিরা প্রতি বছর ৭৫০ হাজার টন ডাল আমদানি করবে।

5. Food Corporation of India. জাতীয় খাদ্য নীতির নিম্নলিখিত লক্ষ্যগুলি বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাধীন ফুড কর্পোরেশন অব ইণ্ডিয়া বা এফসিআই ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল:
১। দরিদ্র কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ন্যায্য মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য দেওয়া
২। পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের (পিডিএস) বা রেশন ব্যবস্থার জন্য সারাদেশে খাদ্যশস্য বিতরণ
৩। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দেশের খাদ্যশস্যের ভাণ্ডারে সন্তোষজনক স্তর বজায় রাখা
৪। উপভোক্তা যাতে ন্যায্য মূল্যে খাদ্যশস্য কিনতে পারে তার জন্য বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা

6. National Small Savings Fund

Back to Home Page

Frontier
Feb 17, 2021


 

Your Comment if any