banner
lefthomeaboutpastarchiveright

নাগরিক সমাজের বিবৃতি

পূর্ব কলকাতার জলাভূমিকে রক্ষা করুন, বাঁচিয়ে রাখুন

বিপদ ঘণ্টি!
রাজ্যের পরিবেশ-মন্ত্রীকে ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড্‌স ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (ই.কে.ডব্লু.এম.এ-র) সভাপতির দায়িত্বে নিয়ে আসার লক্ষ্যে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ) আইন, ২০০৬-এর সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে। খবরে প্রকাশ: আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত, আদালতের রায়ে সুরক্ষিত এই অনন্য পরিবেশ ঐতিহ্যটির নব্য-নিয়োজিত সভাপতি ঘোষণা করেছেন যে জলাভূমি এলাকার খালি জমিগুলিকে সরকার এমনিভাবে ফেলে না রেখে ব্যবহার করতে আগ্রহী। পরিবেশ মন্ত্রী-তথা আবাসন দফতরের মন্ত্রী-তথা কলকাতার মহানাগরিকের উপরোক্ত ঘোষণাটি পরিবেশকর্মী ও অন্যান্য নাগরিকের মনে রীতিমতো শঙ্কা ও উদ্বেগের সঞ্চার করেছে।

শঙ্কা ও উদ্বেগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আইনলঙ্ঘণের এক সুদীর্ঘ ইতিহাসের নিরিখে সংশ্লিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এবং এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল সমাজ উপরোক্ত ঘোষণাটিকে বিচার করে আশঙ্কিত হচ্ছেন। একাধিক আদালতের রায়ের সুবাদে, ২০০২ সালে রামসারের আন্তর্জাতিক মানের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির তালিকায় আসার সুবাদে, এবং এই জলাভূমিকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট আইন থাকার সুবাদে এই জলাভূমিটির থাকার কথা দেশের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইনি সুরক্ষা কবচ। অথচ একথাও কারুর অজানা নয়, দশকের পর দশক ধরে, কর্তৃপক্ষের চোখের ওপর, আইনকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, এর ভেতর অনধিকার প্রবেশ ও নির্বিচারে জলাভূমি বোজানোর ঘটনা ঘটে চলেছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, পূর্ব কলকাতা জলাভূমির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (ই.কে.ডব্লু.এম.এ) হল একমাত্র আইনি কর্তৃপক্ষ এতকাল যার সভাপতি হিসেবে থেকেছেন স্বয়ং মুখ্যসচিব অথচ এই কর্তৃপক্ষের দায়ের করা ২০০-র বেশি এফ.আই.আর বিষয়ে পুলিশ কোনো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এতকাল ধরে জলাভূমি ভরাট করে একের পর এক নির্মাণ প্রকল্প চলার এই চূড়ান্ত বে-আইনি কার্যকলাপ একটি মারাত্মক কেলেংকারি। আর ই.কে.ডব্লু.এম.এ-র বর্তমান সভাপতি তাঁর এই পদে আসার কয়েক মাস আগে থেকেই এই জলাভূমির জমিতে নিষিদ্ধ কার্যকলাপ চালানোর এবং এখানে নির্মাণগুলিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন রাজ্যে কম আলোচিত জলাভূমিগুলির ক্ষেত্রেও একই রকম বেআইনি কাণ্ডকারখানা চলছে।    

আরও এক ভাবে পূর্বকলকাতা জলাভূমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ময়লা জলের যথাযথ ব্যবহার করেই এই জলাভূমি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই বিশেষ প্রাকৃতিক ব্যবস্থার বেঁচে থাকার উৎস এই ময়লা জলের সরবরাহ। গত বেশ কয়েক বছর ধরে এই জলাভূমিতে ময়লা জলের সরবরাহ ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্য দিকের বিপদ হল, জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে যে ময়লা জল পরিশোধনের ব্যবস্থা চালু ছিল, তা বন্ধ করে সরাসরি নদীতে চালান করে সুন্দরবন মোহানা অঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় দূষণ বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। 

ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদ যা ধ্বংস হতে চলেছে
কমবেশি ১২৫০০ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত এই পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে স্থানীয় মানুষের পরিচালনায় চালু রয়েছে আবর্জনা পরিশোধন এবং খাদ্য উৎপাদনের এক অতুলনীয় ব্যবস্থা। পরিবেশ সচেতনতা এবং পঠন পাঠনে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার কার্য কারণগুলির অনুসন্ধান এবং চিহ্নিতকরণের অনেক আগে থেকেই এই প্রাকৃতিক পরিচালন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।  

পূর্ব কলকাতা জলাভূমির অবদান 

* নিখরচায় কলকাতার নিষ্কাশিত নর্দমার জলের পরিশোধনের ব্যবস্থা
* বিপুল খরচসাপেক্ষ প্রচলিত ময়লা জল পরিশোধনের ব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয় করে দেওয়া
* প্রচুর পরিমাণে সস্তায় মাছ এবং শবজি ফলনের ব্যবস্থা করা
* বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা
* জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ
* বায়ুমন্ডলের কার্বন সঞ্চয়ে সাহায্য করা
* শহরের আবহাওয়া রক্ষায় সাহায্য করা এবং ঋতু পরিবর্তনেজনিত সমস্যা হ্রাস করা
* একটি বড় জলাভূমি এবং রিসাইক্লিং-নির্ভর জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখা

আশু ও জরুরি প্রয়োজন
এই অসাধারণ সম্পদের প্রতি সরকারি উদাসীনতার দুঃখজনক পরিপ্রেক্ষিতে ই.কে.ডব্লু.এম.এ-র সভাপতির বক্তব্য শঙ্কা উদ্রেক করে। সঙ্গতভাবে মনে হয় এই জাতীয় বক্তব্যগুলি এই জলাভূমিগুলির উপর বিভিন্ন দিক থেকে আসা হামলাকগুলির ন্যায্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা ও সেগুলিকে আইনি ভিত্তি প্রদানের চেষ্টা। খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে একটি বহুমুখী নাগরিক উদ্যোগের, যা এই জলাভূমিকগুলিকে রক্ষা করার উপস্থিত প্রয়াসগুলিকে শক্তিশালী করবে ও একত্র করবে। সবুজ মঞ্চের উদ্যোগে এমনই একটি নাগরিক প্রয়াসের প্রশস্ত মঞ্চকে উৎসাহিত করা হচ্চে এবং সেই সম্মিলিত প্রয়াসকে গণসমক্ষে উপস্থিত করার লক্ষ্যেই এই সাংবাদিক সম্মেলন।

আমাদের দাবি
১। কোনো অজুহাতেই পূর্ব কলকাতা জলাভূমি হিসেবে নির্ধারিত এলাকায় আর কোনো বেআইনি হস্তক্ষেপ বা দখল বরদাস্ত করা চলবে না। 

২। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এলাকায় দূষণকারী প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ও চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কারখানা সহ সমস্ত বেআইনি কাণ্ডকারখানা ও দখলগুলিকে চিহ্ণিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিয়ে জলাভূমির পূর্বতন অবস্থা চরিত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।  

৩। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক সবকটি সরকারি দফতরকে—বিশেষত রাজ্য পরিবেশ দফতর, পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, মৎস্য দফতর, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরকে—পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে নিজেদের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং আইনের প্রয়োগ কঠোরভাবে করতে হবে।  

৪।  বিভিন্ন পুলিশ থানায় ই.কে.ডব্লু.এম.এ.-র যে ২০০-র বেশি এফ.আই.আর দায়ের রয়েছে তার ভিত্তিতে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও, এই বিষয়ে পুলিশের যে সব পদাধিকারী ও কর্মচারী তাঁদের কর্তব্যের গাফিলতি করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।   

৫।  যথাযথ উদ্যোগ ও ব্যবস্থা না গ্রহণ করার জন্য ই.কে.ডব্লু.এম.এ.-কেও দায়ী সব্যস্ত করতে হবে এবং সব দায়ী ব্যক্তিদের পূর্ব কলকাতার জলাভূমির আইনি সংরক্ষণে ত্রুটির জন্য জবাবদিহি করতে হবে।  

৬। জলাভূমি সংক্রান্ত আইন ভাঙার জন্য ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ভাবে থানায় যে সব অভিযোগ বা এফ.আই.আর দায়ের করা হয়েছে সেগুলির বিষয়ে দ্রুত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের সহায়তার জন্য একটি ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু করতে হবে যার মাধ্যমে নাগরিকরা অবিলম্বে অভিযোগ জানাতে পারেন।  

৭। ১৯৯২ সালের ২৫৮১ নং মামলার বিষয়ে কলকাতা হাই কোর্টের রায়, অন্যান্য মামলায় আদালতের রায় এবং পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ) আইন, ২০০৬-এ নির্দেশিত নিয়মাবলীর লঙ্ঘণ বিষয়ে  তদন্তের এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টের বিচারকের নেতৃত্বে একটি জুডিশিয়াল কমিশন নিয়োগ করতে হবে।   

৮। হাজার হাজার কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, জঞ্জালকর্মী এবং এই জলাভূমি এলাকার উপর পরম্পরাগতভাবে নির্ভরশীল অন্যদের জীবিকার অধিকারকে কার্যকরী আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে।

৯। মৎস্যচাষের জন্য প্রয়োজনীয় ময়লা জলের যথেষ্ট জোগান সুনিশ্চিত করতে হবে এবং তার জন্য খালগুলির ড্রেজিং ও অন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে এই মৎস্যক্ষেত্রগুলি ভালোভাবে টিকে থাকে এবং আমাদের মোহানা ও উপকূলীয় জলসম্পদ কলকাতার ময়লা জল-জনিত অতিরিক্ত দূষণ থেকে রক্ষা পায়।     

১০। পূর্ব কলকাতার জলাভূমির সীমানা ধরে নানান জায়গায় চোখে পড়ার মতো করে হোর্ডিং দিতে হবে যাতে এই জলাভূমি এলাকাটি সম্পর্কে সবাই অবহিত থাকেন এবং দুষ্কৃতিরা সাবধান হয়। 

১১। পূর্ব কলকাতার জলাভূমির সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে এই রাজ্যের অন্য সব জলাভূমির সার্বিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে হবে। 

 

সুজয় বসু

অরুণাভ মজুমদার

ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ

সুকান্ত চৌধুরি

শাশ্বতী সেন

অরুণকান্তি বিশ্বাস

সুভাষ দত্ত

তুষার চক্রবর্তী

এন। সি। জানা

দেবসেনা রায়চৌধুরি

শশাঙ্ক দেব

শান্তনু চক্রবর্তী

বনানী কক্কর

শান্তি রঞ্জন হালদার

নব দত্ত

প্রদীপ কক্কর

ধ্রুবা দাশগুপ্ত

তৃণাঞ্জন চক্রবর্তী

আশিষ ঘোষ

শুভমিতা চৌধুরি

প্রদীপ চ্যাটার্জি

বিশ্বজিৎ মুখার্জি

সুদেষ্ণা ঘোষ

পামেলা মুখার্জি

তাপস ঘটক

বিপ্লব বসু

পবন মুখার্জি

জয়ন্ত বসু

অর্জন বসু রায়

ও অন্যান্য উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ
যোগাযোগ: নব দত্ত: 9831172060

Mar 05, 2017