banner
left-barhomeaboutpast-issuesarchiveright-bar

 

অরণ্যের অধিকার কার? আদিবাসী ও অন্যান্য বনবাসীদের? নাকি বন বিভাগ, কাঠ মাফিয়া আর কর্পোরেট কোম্পানিদের?

সুমিত সরকার

আমরা ধরে নিচ্ছি যে সবাই মোটামুটি অবগত আছেন যে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের প্রতিক্রিয়ায় যে ব্যাপক মাত্রায় বায়ু দূষণ হচ্ছে সেটা থেকে বাঁচতে হলে বড় বড় গাছের বন থাকা যে দরকার সেই নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমরা অর্থাৎ ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দারা প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ শহরেই থাকি আর শহরে বড় গাছ প্রায় নেই আর থাকলেও কেটে ফেলার ধুম লেগেছে। তাহলে বন থাকতে হয় গ্রামে, আর পাহাড়ি এলাকায়। কিন্তু দেশের বেশীর ভাগ গ্রামে বন নেই। যদিও দেশের মোট জমির কমপক্ষে শতকরা ৩০ ভাগ জমিতে জঙ্গল থাকা উচিত। নাহলে আমরা কেউ বেঁচে থাকতে হলে ন্যূনতম যে অক্সিজেন দরকার সেটা পাব না। তাহলে উপায়? আপনি হয়তো বলবেন, না না, অত দায়িত্ব আমরা নিতে পারব না। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট তো আছেই। তারাই বন বাড়াবে, বন বাঁচাবে।

সত্যিই কি তাই? ব্রিটিশরা এদেশে প্রথম বন আইন তৈরি করেছিল নিজেদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ সিদ্ধি করার জন্য আঠেরো শতকে। । ইংরেজরা তাদের দেশে ও এদেশে তাদের উপনিবেশ চালানোর প্রয়োজনে কাচা মাল সরবরাহ করতে পাতল রেল লাইন। এই লাইনকে একটা শক্ত ভিতের উপরে রাখতে হয় বলে ব্যাপক মাত্রায় জেলার পর জেলা (যেমন পুরুলিয়া জেলা, বাঁকুড়া জেলার অনেকটা অংশ) থেকে বন প্রায় চেঁছে ফেলে কাঠের লগগুলিকে ট্রেন লাইনের বেস হিসাবে বসিয়ে দিল। ক্রমাগত রেল লাইন বেড়েছে তাই আরও গাছ কাটার দরকার হয়েছে। ধারাবাহিক ভাবে সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট গঠন করেছিল ইংরেজরা। আজ রেল লাইনের নীচে কাঠের পাটাতন বসে না তবুও সভ্যতার চাহিদা মেটাতে ফরেস্ট বিভাগের থেকে প্রতি বছর হেক্টরের পর হেক্টর এলাকার বনভূমি অবিরাম কাটা চলছে। কাঠ হল বাদামি সোনা। বর্তমান সরকার তেমনই এক ১৯২৭ সালের আইনকে নতুন থেকে কবর থেকে তুলে ‘সংশোধন’ করে আমাদের সামনে হাজির করেছে।

১৯২৭ সালের ভারতীয় বন আইন কী বলছে?
মূলত সেই আইনের যে জায়গায় সরকার পরিবর্তন এনেছে সেটা হল এবার থেকে কিছু কিছু বনকে ‘উৎপাদন বন’ নাম দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই এলাকাটাকে তারা বাণিজ্যিক ভাবে কিছু কিছু গাছ চাষ করবে। আরও একটা কারণ আছে এই ব্রিটিশ আইনকে নতুন করে তুলে আনার। ব্রিটিশরা এই আইন দিয়েই সরকারকে কোনো একটা বনকে সংরক্ষিত (রিজার্ভড) বনাঞ্চল হিসাবে ঘোষণার অধিকার দিল। সেই সংরক্ষিত বনের উপর একচ্ছত্র অধিকার রইল কেবলমাত্র সরকারের। যদিও এই আইন অনুসারে কিছু কিছু বনকে সুরক্ষিত (প্রোটেক্টেড) বন বলে ঘোষণা করে সেখানে সাধারণ মানুষের কিছুটা ব্যবহার করার অধিকার মেনে নেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে তা হত না। শুধু মাত্র কাঠের লগ পাওয়া সুনিশ্চিত করার জন্য এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।

এটাই মোটের উপর সরকারি নীতি ছিল ১৯৮০ পর্যন্ত। এরপর সরকারের টনক নড়ল তখন, যখন তারা দেখল যে এভাবে বন ক্রমাগত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জীব বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগ জংগল রক্ষা করতে পারছিল না। বা বলা ভালো কাঠ মাফিয়াদের সাথে যোগসাজশে জঙ্গল লুটপাট হচ্ছিল। এই ১৯৮০ সালের আইন নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনায় যাবার অবকাশ এখানে নেই।

অন্য দিকে বহু আদিবাসী মানুষকে জ্বালানী কাঠ কাটার দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। সামান্য বিড়ি যে আমরা খাই, সেই পাতা যারা বন থেকে তুলবেন তাদের বিশেষ লাইসেন্স থাকতে হত। তা না হলে ঘরে কেউ বিড়ি পাতা তুলে রাখলে তাকে গ্রেফতার করা, ফাইন করা যেত। ভেবে দেখুন, বাঁশ কি কাঠ না ঘাস এই বিতর্কের সমাধান হয়নি। তাই কেউ বন থেকে বাঁশ কেটে নিয়ে গেলে তাকে কেস দেওয়া যেতে পারত। এভাবেই বনের থেকে বহু রকমের সামগ্রী সংগ্রহ করে আদিবাসী মানুষ বিক্রি করতেন। তার উপরেও ছিল বন বিভাগের থাবা। (আজও কি নেই? এখনও তো শালপাতার উপরে ১৮% জিএসটি দিতে হয়।) বনবিভাগের অত্যাচার এমন ছিল যে সামান্য একজন ফরেস্ট গার্ডও একটা গ্রামে ঢুকে লোকের কলাটা, মুলোটা, মুরগিটা, ছাগলটা যখন তখন টেনে নিয়ে যেত। কেস দেবার ভয় দেখাত। এর ফলে এত বছর ধরে চলা ঔপনিবেশিক অত্যাচারের ফলে মারাত্মক কুফল ফলল আদিবাসীদের মানসিকতায়। আদিবাসী ও বনবাসী অন্যান্য সমাজ যারা তাদের চিরাচরিত প্রথা অনুসারে বন কে নিজেদের সমাজ থেকে আলাদা করতে শেখেইনি, তারা ভাবতে শিখল যে জংগল তাদের নিজের নয়। এই যে আদিবাসীদের সাথে বনের বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনল ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ অনুসারী ভারতীয় রাষ্ট্র, তার ফল হল সুদূর প্রসারী। আদিবাসীরা হয়ে গেলেন নিজ ভূমে পরবাসী।

তবে জল-জংগল-জমি-র উপরে অধিকারের দাবীতে বহু সংগ্রামও হয়েছে। সেইসব সংগ্রামের ফলে আজ আদিবাসীদের বনের উপরে যেসব চিরাচরিত অধিকার ছিল সেগুলির অনেকটা স্বীকৃতি পাওয়া গেল প্রথম ২০০৬ সালের ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্টের মাধ্যমে।

সেই অধিকার যদিও বাস্তবত কোথাও ঠিক ভাবে প্রয়োগ হয়েছে এমন বলা যাবে না। তবু কাগজে কলমে বেশ কিছু অধিকার পাওয়া গেছিল এমন বলা যায়। সেই অধিকারগুলিকে আবার ছিনিয়ে নেবার জন্য নতুন করে সংশোধিত ইন্ডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্ট ১৯২৭ হাজির করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে- যদি রাজ্য সরকার কেন্দ্র সরকারের সাথে আলোচনা করে এমন মনে করেন যে ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট ২০০৬ এর জন্য বন সংরক্ষণ (নাকি ধ্বংস) করার প্রচেষ্টা বিঘ্নিত হচ্ছে, তাহলে সেই ব্যক্তিদেরকে কিছু টাকা দিয়ে বা জমি পাইয়ে দিয়ে, বা অন্য কোনো উপায়ে (!) ক্ষতিপূরণ করে দেবেন।

আমরা সরকারি ক্ষতিপূরণ দেবার প্রতিশ্রুতি যে কেমন হয় সবাই জানি। আরেকটা কথা হল, যেসব মানুষ যুগের পর যুগ একটা এলাকায় থেকে সেখানকার প্রকৃতির সাথে মানিয়ে বেঁচে থাকতে শিখেছেন তাকে তার স্বদেশ থেকে তুলে অন্য কোথাও নিয়ে গেলে তার ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠী জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে সেটা বুঝবার ইচ্ছা বা প্রয়োজন সরকারের কোনো কালেই ছিল না, এখনও নেই বলে বোঝা যাচ্ছে।

২০০৬ সালের বন অধিকার আইন কী বলছে?
এই আইনে প্রথম বনবাসী আদিবাসী মানুষদেরকে বনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মেনে নিলো। মেনে নিলো কারণ দেখা গেল যে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট না, যেসব জঙ্গল এলাকায় বন রক্ষা কমিটি ধরনের সংগঠন গড়ে উঠেছে ও সক্রিয় থেকেছে, তারাই বন রক্ষা করতে পেরেছেন।

এই আইনে বিশেষ ভাবে আদিবাসীদের ও তিন পুরুষ ধরে যারা বনের মধ্যে বা আশেপাশে থাকছেন তাদের ক্ষেত্রেই এই মান্যতা দেওয়া হল। এর কারণ হল গড়পড়তায় দেখা গেছে যেখানে এই ধরনের সমাজ থাকছেন তারা বন রক্ষা করেছেন তাদের চিরাচরিত রীতি নীতি অনুসারেই। বন তো আগে সব এলাকাতেই ছিল, যারা আদিবাসী নন তারা সেগুলিকে কেটে ফেলে গ্রামের আশেপাশে দিগন্ত বিস্তৃত এলাকা বৃক্ষ শূন্য মাঠ বানিয়ে ফেলে দিব্যি গর্ব বোধ করছেন।

এই আইনে এমন বহু প্রয়োজনীয় জিনিস যেগুলি বনবাসী মানুষ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন এবং সংগ্রহ করে বিক্রি করেন সেগুলির উপরে আদিবাসীদের অধিকার মেনে নিলো। এই আইনেই গাছের লগ কাটার পরে পড়ে থাকা যেকোনো ছাটাই কাঠ, বাঁশ ইত্যাদির উপরে গ্রাম সমাজের অধিকার মেনে নিলো সেগুলি বিক্রির অধিকার সহ। যদিও এই আইন কাঠের লগ হতে পারে এমন গাছের উপর বনবাসী ও আদিবাসীদের প্রত্যক্ষ অধিকার মানল না। যদিও বনবাসী মানুষ সক্রিয় ভাবে জঙ্গল রক্ষা না করলে কোনো বনই টিকতে পারে না।

এই আইনে জঙ্গলের জমিতে স্কুল, রাস্তা, পুকুর, কমিউনিটি হল ইত্যাদি জন কল্যাণমূলক কাজ করার অধিকার দিল গ্রাম সভার অনুমতিক্রমে। এই দিক থেকে গ্রাম সভা অনেক বড় অধিকার পেল। এখন সরকার বাহাদুর চাইছেন আইনের পরিবর্তন করে গ্রাম সভার অনুমতি এড়িয়ে কতটা জমি খনি কোম্পানি, ও অন্যান্য ধরনের কারখানাগুলিকে সরাসরি দিয়ে দেওয়া যায়। আসলে গ্রাম সভার সমস্ত অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে সরকার। ‘উৎপাদন বন’ তৈরির প্রস্তাবও একই রকমের কর্পোরেট তোষণের কায়দা।

যারা জঙ্গলের ভেতরে তিন প্রজন্ম ধরে (অর্থাৎ ২৫×৩=৭৫ বছর) বসবাস ও চাষ করছেন তাদের সেই অধিকার মেনে নিলো এই আইন। মূলত আইনের এই অংশটাকে সরকার ও কর্পোরেট হাউজের ভারী অপছন্দ, তাদের সাথে কিছু শৌখিন পশুপ্রেমীও যুক্ত হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে তাদের আপাত দাবী হল বনের পশুদের বেঁচে থাকবার স্বার্থে বনের ভেতর বা আশেপাশে যারা বনের জমিতে থাকছেন বা চাষ করছেন তাদেরকে যেন উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়। এই আইনের দোহাই দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে ভারতের ১৬টি রাজ্যের যারা জঙ্গল এলাকায় বাস করছেন কিন্তু এখনো পর্যন্ত অরণ্য অধিকার আইন (ফরেস্ট রাইট অ্যাক্ট) ২০০৬ অনুসারে আবেদন করেও পাট্টা পাননি, তাদেরকে তাদের বাসভূমির থেকে চলে যেতে হবে। এই রায় অনুসারে এইসব বসবাসকারীদেরকে উচ্ছেদ করে দেবার নির্দেশ সরকারকে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য যে এই মর্মে দাবী করছিলেন মামলার আরেক পক্ষ, যাদের যুক্তি ছিল বন্যপশুদের ক্রমাগত লুপ্ত হয়ে যাওয়া ঠেকানোর জন্য বনে বসবাসকারী আদিবাসী ও মূলনিবাসীদেরকে জঙ্গল থেকে বের করে দেওয়া দরকার। মামলার আরেক পক্ষ ভারত সরকার এই দাবীর বিরোধ করতে কোনো প্রতিনিধি পাঠান নি। ফলত এক তরফা রায় ঘোষিত হল। এই রায় শুনে আদিবাসী সংগঠনগুলি সারা দেশ জুড়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচী নেবার ফলে পরিস্থিতিতে সামান্য পরিবর্তন হয়। কিছু দিনের জন্য রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে, তবে রায় বাতিল করা হয়নি। ভারত সরকারের মিনিস্ট্রি অফ ট্রাইবাল অ্যাফেয়ার্সের তথ্য অনুসারে এ পর্যন্ত ৪২.১৯ লক্ষ পাট্টা জমি পাবার জন্য দাবিপত্র জমা পড়েছিল তার মধ্যে এখনো পর্যন্ত মাত্র ১৮.৮৯ লক্ষ দাবিপত্র গৃহীত হয়েছে। সুতরাং অংকের হিসাবে বাকিদের সবাইকে উচ্ছেদ করে দেবার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। এরা হলেন আদিবাসী। এছাড়াও যারা আদিবাসী নন কিন্তু বহু দিন ধরে জঙ্গল এলাকায় বসবাস করছেন তেমন ১৭টি রাজ্যের মোট ৪৪৫০৪৭টি জমির পাট্টা দেবার দাবিপত্র বাতিল হয়েছে। আরও ১৯৫২২২টি দাবিপত্র নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনও বাকি। তবে অরণ্যবাসী মানুষরা আমাদের মতো এত জটিল জগত নিয়ে কারবার করেন না, তাই আইনের এত মার প্যাচও বোঝেন না! বংশানুক্রমিক ভাবে তারা যে জমিতে থেকেছেন, অরণ্যের গাছপালা আর জীবজন্তুর সাথে ভারসাম্য রেখে চলছেন, তার থেকে কলমের এক খোঁচায় তাদের যে উচ্ছেদ করে দেওয়া সম্ভব সেটা তারা কোনো দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। তাই এমন মনে করার কোনো কারণ নেই যে যত জন দাবিপত্র দিয়েছিলেন তার বাইরে আর কেউ অরণ্য এলাকায় বসবাস করেন না কিংবা সেখানে বসবাস করার অধিকারী না। আমরা তো আবার আরেক ধরনের আদিবাসী সমাজের কথা এর মধ্যে হিসেবের মধ্যেই আনি নি। তারা হলেন বির হর। বির হর রা কোথাও স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন না। এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে ঘুরে ফিরে জঙ্গলের উপরে নির্ভর করেই বসবাস করছেন। অনেকে সব মিলিয়ে যে হিসাবে করছেন তার থেকে মনে হচ্ছে সর্বমোট প্রায় ২৭/২৮ লক্ষ আদিবাসী ও অরণ্যবাসী মানুষকে উচ্ছেদ করে দেওয়া হতে পারে।

আমাদের সরকার ও শহুরে বন্যপ্রাণী প্রেমী কিছু পরিবেশবাদীদের যুক্তিটা অনেকটা এই রকম- বন বিভাগ তো আছেই। আদিবাসী ও অন্যান্য বনবাসীদের বন থেকে সরিয়ে দিলে তো বনভূমির বিস্তার আরও বাড়বে। সেটা কি বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের পক্ষে ভালো না? এ হল তাদের বিশুদ্ধ ঔপনিবেশিক মানসিকতা। নিজেদেরকে বেশী পণ্ডিত আর আদিবাসীদের বোকা আর স্বার্থপর ভাবার মানসিকতা।

বাস্তবে কি আদিবাসীদের সাথে বনের বৈরিতামূলক সম্পর্ক?
বনভূমি থাকা মানব সভ্যতা গড়ে উঠবার প্রাথমিক শর্ত ছিল। তখন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ছিল না। বন নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারত। সারা পৃথিবীতে আদিবাসীরা যেখানে থেকেছেন সেখানে বন সুরক্ষিত থেকেছে। কারণ আদিবাসীদের বেঁচে থাকবার ধরন আমাদের শহরবাসীদের মতো না।

আমরা কোনো কিছু দরকার হলে সোজা চলে যাই বাজারে। সেখান থেকে আমাদের দরকারি জিনিসটা কিনে নেই। বাজারে পাওয়া যায় না এমন বিশেষ কিছু তৈরি করতে হলে, (যেমন বাড়ি, বা নিজের পছন্দ মতো ফার্নিচার ইত্যাদি) কিছু বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন মিস্ত্রিকে ডেকে নেই যেন সেই জিনিস তৈরি করানো যায়। তারা আবার একটা ফর্দ করে দেন যা দিয়ে তারা আমাদের চাহিদা মতো জিনিস তৈরি করে দেবেন। সেই জিনিসগুলি আবার আনতে আমরা ছুটে যাই বাজারে, দোকানে। দোকানে বা বাজারে সেই জিনিসগুলি কোথা থেকে এসেছে? কোনোটা একশো কিলোমিটার দূর থেকে গাড়ি করে, কোনোটা আবার পাঁচশো কিলোমিটার দূর থেকে রেলে ট্রাকে করে। এসব করতে বহু শক্তির অপচয় হয়। শক্তি উৎপাদন হয় কোথা থেকে? হয়তো আরব থেকে পেট্রোলিয়াম এলো হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। এসে পেট্রোল শোধনাগারে শোধিত হয়ে তেল হল তারপর সেটা গাড়ির ট্যাংকে ঢুকল। কিংবা কোনো তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎবাহী গাড়িতে করে জিনিসটা খনি বা কারখানা থেকে বাজারে বা দোকানে এসেছে। এই গোটা প্রক্রিয়ায় পরিবেশের আদ্য শ্রাদ্ধ হয়। শ্রমিকদের চুষে নেওয়া হয়। হিংস্রতা প্রয়োগ করা হয়, ভয় দেখানো হয়। বায়ু দূষণ হয়, জল দূষণ হয়, মাটি দূষণ হয়। এই সবই হয়, আমরা সবাই সে কথা যে জানি না তাও নয়, তবে তার জন্য আমাদের আত্মগ্লানি হয় না কারণ সেসব আমাদের চোখের আড়ালে হচ্ছে। কারো কারো আবার এমনকি চোখে সামনেও ঘটছে, আমাদের কেউ কেউ আবার সেগুলি ঘটবার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকাও রাখছি। তবু কেন এমন করছি? কারণ আমাদের মনে হচ্ছে এটাই একমাত্র বেঁচে থাকবার রাস্তা। আর কোনো বিকল্প নেই। কোথাও যদি খুব নোংরা মনে হয় আমরা আমাদের জমি বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে যাব যেখানে কিছুটা পরিবেশ ভালো আছে। কিংবা এমনকি অন্য কোনো শহরে চলে যাব, কিংবা স্রেফ ঘর আর জমি বিক্রি করার পয়সায় আরেকটা ফ্ল্যাট কিনে বাকি টাকা ব্যাংকে রেখে তার সুদে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। এই আমরাই চাই যেন রাষ্ট্রের দেখভালে কোথাও কোথাও বন থাকে আর তাতে কিছু পশু থাকে, আর তার কাছে যেন কিছু আদিবাসী থাকে যারা পয়সা দিলে নেচে কুদে আমাদের কামোত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়ে যাবে।

এর একেবারে বিপরীত মেরুতে আছেন ‘চিরাচরিত’ আদিবাসী সমাজের মানুষ। চিরাচরিত কথাটাতে জোর দিলাম কারণ আগেই যেমন বলা হয়েছে, ব্রিটিশ আমল থেকে আদিবাসী অঞ্চল থেকে বন কেটে ন্যাড়া করে দেওয়ার ফলে, অনেক আদিবাসীরাই আর আদিবাসী থাকতে পারেন নি। অন্য ভাষায় বললে আদিবাসীদের মতো বেঁচে থাকার ধরন ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে শহরে শ্রমিকের পরিচয়ে থেকে গেছেন। শ্রমিক তো সারা পৃথিবীতেই এক রকম। না থাকে তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি বা বিশিষ্ট কোনো দক্ষতা। আদিবাসী শ্রমিক বা চাকরিরত আদিবাসী আসলে বড় জোর আদিবাসী বংশোদ্ভূত মানুষ, আদিবাসী নন। চিরাচরিত আদিবাসীসুলভ দক্ষতা ও বিশেষত্ব তাদের থাকে না। অনেকে আমাদের মত রহনসহন নকল করতে গিয়ে আবার চিরাচরিত আদিবাসীসুলভ দক্ষতা ও বিশেষত্ব ঝেড়ে ফেলতেই পছন্দ করেন। সসব অন্য প্রসঙ্গ।

চিরাচরিত আদিবাসীরা বেঁচে থাকবার জন্য দোকান, বাজার ইত্যাদির উপরে প্রায় নির্ভরই করেন না। বা বলা ভালো করতেন না। তাদের খাবার অনেকটাই বন থেকে পাওয়া যায়, কত রকমের ফল, মূল যে খাওয়া যায় সেটা সেই নির্দিষ্ট বনাঞ্চলের আদিবাসীরাই জানেন। আবার বনের ধারে চাষ করে নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করে নেন তারা। কিছু কিছু আদিবাসীরা তো চাষও করেন না। রোগ হলে তার ওষুধও পাওয়া যায় বন থেকেই - যাকে আমরা শিকড়-বাকড় বলে তাচ্ছিল্য করি। তবে প্রয়োগের দিক থেকে তারা কিন্তু যথেষ্ট কার্যকর। আদিবাসীরা আজও খুবই কমই হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা করাতে। পোশাক তৈরির কাজও কিছু কিছু আদিবাসী মহিলারা করতে পারেন (যেমন উত্তর পূর্ব ভারতের আদিবাসীরা)। মধ্য ভারতের আদিবাসীরা সাধারণত এখানকার পরিবেশ অনুসারে খুব বেশী পোশাকের বাহুল্য রাখেন না। তবে যতটুকু দরকার হয় সেটার জন্য তারা কয়েকটা গ্রাম মিলে কয়েক ঘর তাতিদের জমি দিয়ে বসত করিয়ে থাকেন। তাদের থেকেই তাদের কাপড়ের প্রয়োজন মিটে যেত। তাদের বাড়িঘর তৈরি হয় পার্শ্ববর্তী বনের থেকে আনা ঝাটি, চাষের থেকে পাওয়া খড় আর মাটি থেকে। এই সব ঘর নিজেরাই তৈরি করে নেন তারা। যেটুকু আসবাবপত্র দরকার হয় সেটাও নিজেরাই তৈরি করে নেন তারা। তাদের জীবনযাত্রায় কাউকে অত্যাচার করতে হয় না, পরিবেশের কোনো ক্ষতি করতে হয় না। এহেন আদিবাসীকে যখন বনে ঢুকতে দেওয়া হল না, তখন তো তার জীবন ধারণের উপাদানই কেড়ে নেওয়া হল। তার ফল কী হল? এর ফলে বহু আদিবাসীরই বন বিভাগের সাথে বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি হল। বনের বিচ্ছেদের সম্পর্ক তৈরি হল। অনেকেই চোরাই কাঠ চালানের কাজে যুক্ত হলেন। এমনও হচ্ছে যে অনেক এলাকায় আদিবাসীরা বন রক্ষা করছেন কিন্তু সেটা বনের গাছগুলি চিরকাল থাকুক এই আশা থেকে না। তাদের অনেকেরই উদ্দেশ্য হল গাছ বড় হলে যখন বন বিভাগ গাছ কেটে বিক্রি করে দেবে, তখন তারা যেন সেই থেকে কিছু টাকা লভ্যাংশ পেতে পারে। কোথাও কোথাও বন কাটার তিন ভাগের এক ভাগ টাকা দেবার দাবী তোলা হচ্ছে। বনের গাছ চিরকাল থাকুক তেমন দাবী বড় বিরল। অনেকেই বনের জমি হাসিল করে চাষ করছেন। এভাবেও বন কমছে। অথচ এমন কোনো আদিবাসী নেই যাদের গ্রামের কোনো অংশে সামাজিক ভাবে সংরক্ষিত বনভূমি নেই। এই বনভূমিকে পবিত্র বলে মনে করেন আদিবাসীরা। সেখানে পুজো করা হয় প্রকৃতিকে। বন সংরক্ষণ যাদের সামাজিক রীতি, তাদেরকে উচ্ছেদ করার চক্রান্ত শুরু করেছিল ইংরেজরা যা এখনও অবিরত আছে। আদিবাসীদের এলাকাকে আমরা নিজেদের উপনিবেশ মনে করি। এবং বিভিন্ন অছিলায় তাদের উপরে রাষ্ট্র একের পর এক আক্রমণ নামিয়ে আনছে। কখনো বন সংরক্ষণের নামে, কখনো উন্নয়নের নামে, কখনো বনের পশুকে বাঁচানোর নামে। ২০০৬ সালের বনাধিকার আইন এই বৈরিতার সম্পর্ক শুধরানোর দিকে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেবার সুযোগ করে দিয়েছিল। আজ সেই আইনেরই দোহাই দিয়ে, এমনকি সেই আইনের অধিকারগুলিকে বলতে গেলে বাতিল করে দিয়ে আগের অবস্থায় বা তার চেয়ে খারাপ অবস্থায় আদিবাসী ও অন্যান্য বনবাসীদের ঠেলে দিতে চাইছে সরকার।

তাদের এমন কাজের ফলেই আদিবাসীদেরকে বাজার নির্ভর হতে হয়েছে। যার  ফলে এখন স্থানীয় হাট/দোকান থেকেই জামা কাপড় কিনে পড়ার চলন শুরু হয়েছে। তার জন্য টাকা পয়সার দরকার হচ্ছে। অফিসাররা এক কালে লোভ আর উৎসাহ দিয়ে আদিবাসীদের চিরাচরিত প্রাকৃতিক ধরনের চাষের পদ্ধতি পালটে দিয়েছেন। এখন যে ধরনের চাষের পদ্ধতি এসেছে তার ফলে চাষ করতেও অনেক টাকা লাগছে। সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি কিনতে হচ্ছে। তাই টাকা রোজগার করতে তাদেরকে বাজার নির্ভর হতে হচ্ছে। কৃষিজ পণ্য, বনজ দ্রব্য, বনের ফল, পোষা ছাগল-মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। যেসব এলাকায় বন ধ্বংস হয়েছে সেসব এলাকায় তো এসব অনেক আগেই করতে হয়েছে। তবে যেমন হয়ে থাকে, তাদের বিক্রি করা জিনিসের দাম কম। তাই টাকার চাহিদা মেটাতে ইট ভাটায়, বা শহরে যেতে হচ্ছে মজুর হিসাবে। সেখানে সস্তা মজুর হিসাবে আদিবাসীদের জোগান যেন ঠিক থাকে, সেটাও আদিবাসীদেরকে উচ্ছেদ করার সাম্প্রতিক চক্রান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য।

জবরা পাহাড়িয়া, সিধু কানু, বিরসা মুন্ডা, টানা ভগতের রক্ত যে আদিবাসীদের শরীরে বইছে তারা কি এই ঔপনিবেশিক অবিচার মেনে নেবেন?
জবরা পাহাড়িয়া ছিলেন ভারতের প্রথম ইংরেজ বিরোধী বিদ্রোহের নেতা। নাম শোনেন নি, তাই তো? গুগুল করে জেনে নেবেন। সিধু-কানু নামটা কলকাতাবাসী জানেন রাস্তার নাম হিসাবে। স্কুল পাঠ্যেও কিছুটা জায়গা দেওয়া হয়েছে এই সাঁওতাল (সান্তাড়) লড়াকু বিদ্রোহী দুই ভাইকে। বিরসা মুণ্ডাও অন্যান্য আদিবাসী বিদ্রোহীদের মতোই তীর ধনুক নিয়ে লড়াই করে ব্রিটিশদের নাস্তানাবুদ করেছিলেন। টানা ভগত ছিলেন ভারতের প্রথম অহিংস আন্দোলনকারী ও সমাজ সংস্কারক ওরাঁও আদিবাসী মানুষ। এই অবিচার যে আদিবাসীরা মেনে নেবেন না সেটা সরকার বাহাদুর জানেন। তার প্রস্তুতিও তারা নিয়ে ফেলেছেন। রণসাজে সজ্জিত করা হচ্ছে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টকে। আধুনিক অস্ত্র, আর্মার্ড কার ইত্যাদি মোতায়েন হয়ে গেছে বেশ কিছু এলাকায়। তবে কিনা যুদ্ধ যারা শুরু করেন তারা অহংকারীর মতো মনে করেন যে তারা যেমন চাইবেন, যুদ্ধের পরিণতি তেমনই হবে। কিন্তু কখনই তা হয় না। এই আক্রমণ আদিবাসীদের উপরে যদি নামেই তার ফল যে কী হবে আমরা কেউ জানি না। তবে আমরা নিজেরা কী করব সেটা কি আমরা জানি? আমরা কি সেই হুল বিদ্রোহ ও সিপাহি বিদ্রোহের সময় যেমন করেছিলাম – ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চাটুকারিতা – এখনও তাই করব? নাকি কাউকে শোষণ না করে, পরিবেশকে নষ্ট না করে, বন রক্ষা করে বেঁচে থাকবার যে আদিবাসীসুলভ ধরন, তাকে সম্মান জানিয়ে তাদের এই দুর্দিনে তাদের পাশে থাকব? প্রশ্নগুলো অনেক, তবে এর উত্তরও কি জানি?

Back to Home Page

Frontier
Jul 19, 2018


Sumit Sarkar [email protected]

Your Comment if any