banner
lefthomeaboutpastarchiveright

বামশাসন নিয়ে সিপি এমের দলিলে বুদ্ধ-নীতিরই জয়গান

বিশ্বজিত রায়

ক্ষমতা হারানোর পর এই প্রথম সিপিএমের চলতি রাজ্য সম্মেলনের প্রাক্কালে দলের রাজ্য কমিটির দ্বারা সম্প্রতি গৃহীত একটি দলিল এখন দলের বাইরের মানুষের মতামতের জন্য দলীয় ওয়েবসাইটে তোলা হয়েছে। 'বামফ্রন্ট সরকার একটি পর্যালোচনা (খসড়া)' শীর্ষক  দলিলটিতে  দল ও বামফ্রন্টের 'ত্রুটি ও দুর্বলতাগুলি চিহ্নিত এবং সংশোধনের' উদ্দেশ্যে  'রাজ্যের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তাদের শুভাকাঙ্খী বুদ্ধিজীবিদের এই দুরূহ কাজে সাহায্য' করার আবেদন করা হয়েছে। ঘটনাটি নজিরবিহীন। অতীতে দল ও সরকারের গোপনীয়তার ঘেরাটোপ ভেঙ্গে এমন প্রকাশ্য আলোচনা দূরে থাক, দল ও ফ্রন্টের মধ্যে ভিন্নমত দমনে ভ্রুকুটি ও রক্তচক্ষু প্রদর্শনই আলিমুদ্দিনের দস্তুর ছিল। এখন তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করতে দলের ভিতরেও প্রশ্ন ও সমালোচনা শোনার জন্য নাকি সব স্তরের নেতাদেরই বলা হচ্ছে।  ক্ষমতার মেদ ঝরে যেতে এতকাল কেন্দ্রিকতায় অভ্যস্ত নেতৃত্বের ঔদ্ধত্য ও দম্ভ কমে এলে তা সংকটাপন্ন  সিপিএম এবং বামপন্থীদের পক্ষে শুভ। দলের ভিতরে-বাইরে গণতন্ত্রের প্রতি এহেন সৌজন্য কতটা আন্তরিক তা সময়ই বলবে। তবে কর্তৃত্ববাজির সমস্যাটি শুধু সিপিএমে, এমন তো নয়। ছোট বামপন্থী দল ও গোষ্ঠীগুলিতেও এই ব্যাধি ব্যপ্ত।দক্ষিনপন্থীদের মতো ব্যক্তিপূজা বা পরিবারকেন্দ্রিক চাটুকারিতার সংস্কৃতি এই দেশের বামধারায় কল্কে না পেলেও দলের ক্ষমতাতন্ত্রের নানা স্তরে প্রতিস্পর্ধী প্রশ্ন ও ভাবনাকে দাবিয়ে রাখার প্রবণতা  প্রবল। 
 
তা সিপিএমের গণতান্ত্রিক ভঙ্গি যদি বা ফিরল, মর্মবস্তুতে চর্বিতচর্বন বা  নতুন বোতলে পুরনো মদ গেলানোর চেষ্টা বন্ধ হলো কই ! এই দলিলের মোদ্দা বক্তব্য: ৩৪ বছরের বাম শাসনকালে সাফল্যের দীর্ঘ তালিকার তুলনায় ভ্রান্তি ও ব্যর্থতা নেহাতই স্বল্প ও মার্জনীয়। দল ও সরকারের দিশায় মৌলিক কোনও গন্ডগোল ছিল না।  বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জমানার দলের লাইন জ্যোতি বসুর আমলের ধারাবাহিকতায়।  ফের ক্ষমতায় এলে একই পথে হাঁটবে সিপিএম । তবে দলবাজির বাড়াবাড়ি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি রইলো। দলিলের ঘোষনা:  "রাজ্যের উন্নয়নে কৃষি আমাদের ভিত্তি ও শিল্প আমাদের ভবিষ্যত, এই সঠিক স্লোগানকে সামনে রেখে পরিষেবা, পরিকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা, মানবোন্নয়নের অগ্রাধিকার আরোপ করে কর্মসংস্থান সমস্যাকে যতদূর সম্ভব প্রশমিত করা ও শিক্ষাজগতে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা" দলের অঙ্গীকার। খবরে প্রকাশ, এই খসড়ার মূল লেখক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। স্বাভাবিক ভাবেই এতে তার মত ও পথের জয়গানই বড় হয়েছে। রেজ্জাক মোল্লার মতো আপদ বিদায় হওয়ার পর  রাজ্য কমিটির সিলমোহরও পড়েছে বিশেষ বিতর্ক ছাড়াই। 

এটা স্পষ্ট, দীর্ঘ তিন দশক বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্রকাঠামোয় একটি রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতার কোনো মূল্যায়ন বা তা থেকে কোনো দূরপ্রসারী প্রশ্ন, সংশয় বা উপলব্ধি তৈরী হয়নি সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের মনে । ক্ষমতাচ্যুতির পর ফিরে দেখার সুযোগে নয়া উদারনীতিবাদী আগ্রাসন তথা পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের  অর্থনীতির যুগে মতাদর্শ ও  রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নীতিমালার ক্ষেত্রে কোনো নতুন ভাবনা যা সামগ্রিকভাবে বিশ্ব জুড়ে বামপন্থার সংকটকে কেন্দ্র করে চলা প্রতর্কগুলিকে সমৃদ্ধ করতে পারে, এমন কিছুই এতে নেই। বরং আছে মৌলিক প্রশ্নগুলিকে এড়িয়ে মিথ্যাচার, শুদ্ধিকরণের ভন্ডামির পুনরাবৃত্তি। 

সিপিএমের সমালোচনায় যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে জিতে সরকারে যাওয়ার বিরোধী, আমি তাদের দলে নই। সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ক্ষমতা দখল করেও ঘরে-বাইরে পুঁজিবাদী- সামাজ্যবাদী ঘেরাবন্দীতে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে শাসক কমুনিস্ট ও অন্য বামপন্থীদেরদের নানা ধরনের আপস করতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে।  ক্ষমতাদখলের পথ নিয়ে বখেড়া বা তার মীমাংসাই আর শেষ কথা নয়। বিপ্লব-পরবর্তী এইসব আপসের নেপথ্যে বিদ্যমান বাস্তবতাজনিত পশ্দাপসরনের অনিবার্যতা কতটা, কতটাই বা নেতৃত্বের ভ্রান্তি, কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর বিড়ম্বনাই বা কতদূর ---এসব প্রশ্নে আন্তর্জাতিক-দেশীয় বাস্তবতা ও মতাদর্শের প্রণোদনা,  রণনীতি ও রণকৌশলের মধ্যে টানাপড়েনের ইতিহাস আমরা জানি। তাই স্রেফ বিপ্লবভীরুতার সমালোচনাই আজ আর সমালোচকের প্রস্থানবিন্দু হতে পারে না। আমার কাছে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক-- ষাটের দশক থেকে কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ এবং পর়ে  ত্রিপুরায় সরকার গঠনের পিছনে সিপিএমের যে মৌলিক দিশাগত ভাবনা ছিল তার প্রতি দল কতটা বিশ্বস্ত থেকেছে ? ১৯৬৪' র পাটি কর্মসূচি থেকে ২০০০ সালে তার 'সময়োপযোগী পরিবর্তন' এবং পরবর্তী এক দশকে তার ব্যাখ্যা- টীকা- ভাষ্য কতদূর সেই মৌল নীতিগুলির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ রইলো? কেন আমরা শুধুই পশ্চাদপসারণ, অধ:পতন দেখলাম? 

মূল পার্টি কর্মসূচির ১১২ নম্বর ধারায় বাম-নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল রাজ্যস্তরে মানুষকে 'আশু রিলিফ' দেয়ার পাশাপাশি  'শ্রমিকশ্রেনীর বৈপ্লবিক আন্দোলনে বিরাট প্রেরণা সঞ্চার' -এর আকাঙ্খা। কেরালায় প্রথম নাম্বুদিরিপাদ সরকার ও পশিচমবঙ্গের দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের তৎরতার জেরে এধরনের  সরকারের 'মেয়াদ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা'র কারণে তখনও দল এইসব 'অতিক্রান্তিকালীন' সরকারের প্রতি 'অতিরিক্ত মোহ পোষণের' বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু 'প্রাক-উদারীকরণ ও উত্তর-উদারীকরণ' দুই পর্বেই বামফ্রন্ট সরকারগুলি টিঁকে যাওয়ায়, বিশেষ করে ভঙ্গবঙ্গে দল ও সরকারের মৌরসী পাট্টা নিস্চিত হওয়ায় বদলে গেল মতটা।  এবার শুরু হলো নিজেদের সূচনাবিন্দু থেকে দ্রুত সরে আসার প্রক্রিয়া। ২০০০ সালে দলীয় কর্মসুচিতে  'সময়োপযোগী' পরিবর্তন এনে  'অতিক্রান্তিকালীন' শব্দটা তুলে নেওয়া হলো।  কেননা 'মনে হতে পারে এই সরকারগুলি যেন ক্রান্তি বা বিপ্লবের আগে গড়ে ওঠা স্বল্প মেয়াদের বলেই ধরে নেয়া হচ্ছে। বলা  হলো,  পুরনো 'আশু রিলিফ-এর বিনম্র কর্মসূচির' বদলে 'জনগনের সমস্যাবলী প্রশমনের' কর্মসূচি' নিয়ে 'বর্তমান সীমাবদ্ধতার মধ্যে  বিকল্প নীতি গুলি তুলে ধারা ও প্রয়োগ করার চেষ্টা' করবে।'  শুধু রাজ্যে নয় 'কেন্দ্রেও  এই ধরণের সরকার গঠনের সুযোগ গ্রহণ করেও'  অঙ্গীকার রইলো 'বর্তমান বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র  ও সরকারের অপসারণের আবশ্যকতা সম্পর্কে ব্যাপকতম জনসাধারনকে শিক্ষিত করা এবং গণআন্দোলনকে  শক্তিশালী ' করার।  কিন্তু বিকল্প কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও শাসক শ্রেনীগুলির সঙ্গে সংঘাতে নেমে গণচেতনা ও গণ আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি পালনের দায় থেকে বাঁচার নানা  প্যাঁচপয়জারও বেড়ে গেল পরবর্তী বছরগুলোয়।

বর্তমান দলিলের ব্যাখ্যা: 'বিকল্প মানে তা কখনই সমাজতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক বিকল্প নয়, এমনকি সব সময় বাম গণতান্ত্রিকও নয়।  বাম সরকার 'গণমুখী' হবে বটে।  কিন্তু দল যা দেশ জুড়ে বিকল্প বলে তুলে ধরবে তার সবটাই কার্যকর করার আশু দায় তার থাকবে না।  তিন রাজ্যে  বাম সরকারের কর্মসূচি রূপায়নের অগ্রাধিকার বা পদ্ধতি এক হবে না। সোজা কথায়, ভাবের ঘরে চুরি চালিয়ে যাব। রাষ্ট্র ও শাসক-শোষক শ্রেণীগুলির সঙ্গে সংঘাতে যাব না।  যে কোনো মূল্যে সরকার বাঁচাতে হবে, ক্ষমতা হারানো চলবে না।  পরিণতিতে তিন রাজ্য সরকারের বিকল্প নীতির প্রয়োগগুলি তুলে ধরে সারা ভারতে বাম বিকল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার প্রাথমিক প্রকল্পও শিকেয় তোলা হল।  হিন্দি বলয় সহ দেশের নানা জায়গায় গণচেতনা ও গণসংগ্রাম বিকাশের লক্ষ্যে  নিজেদের দুর্গে ও তার বাইরে কাজে ও কথায় সাযুজ্য রেখে রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রভাব বিস্তার দূর অস্ত, ভন্ডামি-ঔদ্ধত্যের  ধারাবাহিকতায় অধ:পতনের বেগ এত প্রবল হয়ে উঠল শেষ কয়েক বছরে যে ভঙ্গবঙ্গে দলের দুর্গ আজ ধূলিসাৎ।  

কৃষি: মার্কস ম্যাকিনসেকে মেলানোর চেষ্টা                                        
কোনো সন্দেহ নেই সীমিত ভূমিসংস্কার তথা বর্গারেকর্ড ও কিছু উদ্বৃত্ত জমি বন্টন, পঞ্চায়েতিরাজ প্রবর্তন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদির জেরে প্রথম দুই বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কৃষিতে উৎপাদনবৃদ্ধি ঘটে, ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ে। গরিব ও প্রান্তিক মানুষের রোজগার বাড়ে, গ্রামীন উন্নয়নে তাদের ভূমিকায় কংগ্রেসী আমলের তুলনায় বড় পরিবর্তন আসে। গরিব মানুষের কিছুটা আর্থ-সামাজিক ক্ষমতায়নের ফলশ্রুতিতে মানবন্নোয়ন সূচকগুলিতেও কিছু উন্নতি ঘটে। সীমিত ভূমিসংস্কারের এই সাফল্যকে 'আশু সমস্যার সুরাহার চেয়ে কিছুটা বেশি' বলে আত্মপ্রসাদ লাভের পর্ব স্বাভাবিকভাবেই স্থায়ী হয়নি। নয়ের দশকের গোড়া থেকে কেন্দ্রে উদার অর্থনীতির কারণে কৃষিতে উত্তরোত্তর বাজারী শক্তিগুলির রমরমা বাড়ে  ও কৃষি ক্রমশ অলাভজনক হয়ে পড়ে। রাজ্যে জমির ক্রমান্বয় খন্ডিভবন ছোট জমির মালিকদের সংকট আরও বাড়ায়।  বর্গাদার -পাট্টাদাররা অনেকে জমি হস্তান্তর শুরু করায়  ফের বেআইনি ও আইনি পথের জমির কেন্দ্রীকরণ শুরু হয়। এই সমস্যার উল্লেখ দলিলে আছে। স্বীকার করা হয়েছে, 'ক্ষুদ্র খণ্ডিকৃত জমির মালিকানার পরবর্তী স্তর কি হবে তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা সুরু হলেও নির্দিষ্ট কোন পথ বের হয়নি', উৎপাদনে স্থিতাবস্থা কাটানো বা নতুন পরিস্থিতিতে কৃষি উপকরণগুলি যোগান ও ফসল সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার পরিকাঠামো প্রশ্নে  বিকল্প ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা  যায়নি। কিন্তু কেন তা যায়নি, কতটা আন্তরিকভাবে তার চেষ্টা হয়েছিল তার কোনও উল্লেখ বা বিশ্লেষণ নেই। যদিও 'সমবায় ভিত্তিক ব্যবস্থা'কে একটি বিকল্প হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে আমরা এনিয়ে কোনও সিরিয়াস পরীক্ষা নিরীক্ষা দেখিনি। পশ্চিম ভারতের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে সমবায় আন্দোলন দুর্বল বহুদিনই নানা কারণে । কিন্তু বামপন্থীরা এনিয়ে গভীর ভাবনাচিন্তা করেছেন, এমন বদনাম কেউ দিতে পারবেন না।

অন্য দিকে কৃষিতে কেন্দ্রীয় নয়া উদারবাদী নীতিগুলির বিরুদ্ধে বিবৃতিবাজির বাইরে তৃণমূল স্তরে কোনো কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি ক্ষমতাসীন বামেরা। বরং ক্রমশ কৃষিতে, দেশী-বিদেশি বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসনের কাছে লাগাতার আত্মসমর্পণ করেছে। তা সে বীজ-সার সরবরাহ, ফরমায়েসী অর্থকরী ফসলের চুক্তি চাষ, কৃষিপন্য ব্যবসায় বড় কোম্পানি গুলির স্বার্থে গ্রামীন জমির মালিকানায় উর্দ্ধসীমায় ছাড় বা জিন- প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ হোক বা  'খেত থেকে খাবার টেবিল' পর্যন্ত বৃহৎ পুঁজির আরোপিত শৃঙ্খলার বন্দনা -- মার্কস আর ম্যাকিনসেক়ে, আম্বানি আর আদার ব্যাপারীদের  মেলানোয়  ভট্টাচার্যি সরকারের প্রচেষ্টার কথা আমরা ভুলে যাই নি।  দলিলে বলা হচ্ছে : 'সীমিত ভূমি সংস্কারের ফলে সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ককে যতখানি আঘাত করা গিয়েছিল তার সঙ্গে সংগতি রেখে পুঁজিবাদী সম্পর্কের বিকাশ ঘটছিল।' ফলে 'গ্রামাঞ্চলে 'নব্য ধনী শ্রেণীর  হাতে জমি ছাড়াও অকৃষি ক্ষেত্র থেকে অর্জিত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল, বৈষম্য বাড়ছিল।  এরা বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামোর ( পড়ুন পঞ্চায়েত ও গ্রাম-লাগোয়া পুরসভা ) মধ্যে  সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের কাজে সক্রিয় ছিল।'  কিন্তু যেটা উহ্য থেকেছে তা হল উদারনীতির অভিঘাতে অলাভজনক কৃষির জেরে জমি-হারানো, রুজি-হারানো গরিব, মধ্য কৃষকের একাংশ  ও খেত মজুরদের তুলনায় গ্রামে সিপি এমের মূল শ্রেণী ভিত্তি হয়ে উঠেছিল এই উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীই। বর্গাদার বা মুনিষ  দিয়ে চাষ করানোর  পাশাপাশি  স্কুল মাস্টার, পঞ্চায়েতের মেম্বার, শ্যালো ভাড়া -খাটানো, ফসল কেনাবেচা ও আড়তদার, সার-শাড়ির দোকানদার, মোটরসাইকেল-টিভির  ডিলার, ট্রান্সপোর্ট  এবং সুদের ব্যবসায়ী  এই শ্রেণীই হয়ে উঠেছিল  গ্রামবাংলায় পার্টির প্রতাপ তথা লেভিয়াথনিক ক্ষমতাতন্ত্রের প্রধান ধারক-বাহক।  শেষদিকে পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভায় মাস্টারদের হেজেমনি কমানোর চেষ্টা করে পিছিয়ে এসেছে পার্টি ক্ষমতার টিঁকে থাকার লজিকেই। দলের ভিতরে-বাইরে এই নব্য ধনীদের প্রবল প্রভাবের কারণে বিকল্পের আয়াসসাধ্য পথগুলিতে হাঁটার চেষ্টাই করেনি মার্কসবাদীরা।  

শিল্প: কর্পোরেট পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ 
তবে দলের অবক্ষয়ের মূল কারণ এরা নয়। একদা কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের পেছনে ফেলে উত্তরোত্তর মধ্যবিত্ততায় ডুবে যাওয়া নেতৃত্ব নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির সঙ্গে আপস করতে করতে শেষ পর্যন্ত বড় পুঁজির প্রেমিকে পরিণত হয়। কর্মসংস্থানমুখী শিল্পের প্রশ্নে সাবেকি সোভিয়েত মডেলে রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রভিত্তিক প্রথাগত বামপন্থী বিকল্প অথবা দক্ষিণ আমেরিকায় নানা বিকল্প বামপন্থার মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজ্যের উপযোগী শ্রমনিবিড় ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে কোনও দ্বিমত নেই: গ্রামে-শহরে ক্রমবর্ধমান বেকারীর মোকাবিলা, বন্ধ কলকারখানার সংখ্যাবৃদ্ধি মোকাবিলা করতে  কর্মসংস্হান বাম সরকারের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। গ্রামে কৃষি ও অকৃষি ক্ষেত্রে রুটিরুজির ব্যবস্থার পাশাপাশি কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন জরুরী। কিন্তু সেই শিল্পায়নের চরিত্র কি হবে, পুঁজি-প্রযুক্তি-প্রকরণ, কাঁচামাল, বাজারিকরণ কিভাবে হবে এসব নিয়ে দলের ভিতরে বাইরে কোনো ধারাবাহিক আলোচনা, সমীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে বিকল্পের ভাবনাকে পরিপুষ্ট করার কোনো উদ্যোগ দেখিনি।   দলিলে বলা হয়েছে: ঐতিহাসিক কারণে একদা শিল্পে অগ্রসর পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীনতার পর কেন্দ্রে কংগ্রেস  সরকারের মাসুল সমীকরণ নীতি, লাইসেন্স-পারমিট রাজ, কমুনিস্ট-বিরোধিতার কারণে পুঁজি-পলায়নে উস্কানি এবং ষাট-সত্তরের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিল্পে অধোগামী হয়েছে।  একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের উদারবাদী নীতির জেরে শিল্পে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বন্ধ, অন্যদিকে রাজ্যের সীমিত আর্থিক সাধ্য সংকটকে তীব্র করেছে। কেন্দ্রীয় বিরোধিতা সত্ত্বেও সল্ট লেক ইলেক্ট্রনিক কমপ্লেক্স, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল বা বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। কিন্তু  প্রশ্ন থেকে যায়, আটের দশকে রাজ্যের হাতে অধিক আর্থিক-প্রশাসনিক ক্ষমতার দাবিতে প্রচারের পর নয়ের দশকে নয়া উদারনীতির জমানায় রাষ্ট্রীয় সেক্টরে শিল্পায়নের জন্য, শ্রমিক-কৃষক-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব অস্বীকারের বিরুদ্ধে পথে নেমে বামপন্থী আন্দোলন কতটুকু হয়েছে?  বরং ৩৪ বছরের প্রথম পর্বে ভারসাম্য রক্ষার নানা প্রচেষ্টার পর শিল্পায়ন- উন্নয়নের এই কেন্দ্রীয় মডেলের বক্তৃতাসর্বস্ব  বিরোধিতার আড়ালে ক্রমশ কেন্দ্রের উদারনীতির সঙ্গে সহবাসের শয্যা সাজাতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি কি ফ্রন্ট সরকার?                  

দলিলে জ্যোতি বসুর আমলে  'শিল্পসংক্রান্ত নীতি বিবৃতি ১৯৯৪'-র ধারাবাহিকতায় বুদ্ধবাবুর পর্বকে দেখাতে গিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে: " নয়া উদার নীতিতে শাসক শ্রেণী যে উদ্দেশ্যেই মাশুল সমীকরণ নীতি এনং লাইসেন্সিং ব্যবস্থা শিথিল করুক, ঘটনাক্রমে তার ফলে আমাদের রাজ্যে শিল্প বিকাশের পথে কেন্দ্রীয় নীতির বৈষম্যজনিত বাধাগুলি অনেকটা দূর হয়েছিল এবং আমাদের শিল্প প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কৃষিতে সাফল্য, রাজ্যের অর্থনৈতিক সামাজিক অগ্রগতির কথা  মাথায়  রেখে নতুন সুযোগ যতটা সম্ভব ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম। ''  তা হলে তো উদারনীতিতে রাজ্যের বেশ লাভই হয়েছে? তাই যদি হয় তাহলে আর সে নীতির বিরোধিতা কেন? ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অসম বিকাশের দেশে রাজ্যগুলির মধ্যে পুঁজিপতিদের মনোরঞ্জনের প্রতিযোগিতা কার স্বার্থে? শেষ পর্যন্ত তা রাজ্যগুলির কৃষক-শ্রমিক, আদিবাসী তথা সংখ্যাগুরু গরিব মানুষের স্বার্থবিরোধী জমি ও করনীতি সহ একাধিক ক্ষেত্রে সরকারী খাজনা থেকে কর্পোরেটদের বিপুল ভর্তুকির পথে হাঁটতে বাধ্য করেনি কী?  সিপি এম যদি নেহাতই ফেডারেলিজমের ধুঁয়ো তোলা একটি প্রাদেশিক বা প্রান্তীয় বুর্জোয়াদের দল না হয়ে থাকে তাহলে দলের নেতাদের মার্কসীয় শ্রেণীচেতনা কী বলে? দলিলে রাজ্যে রাজ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে 'নীতিগত অবস্থানে কোনো আপস না করে রাজ্যের সংগৃহীত সম্পদের মধ্য থেকেই প্রতিযোগিতা-সক্ষম ব্যবস্থা গ্রহণের' দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি কেন্দ্রীয় উদারনীতির বিরুদ্ধে বিবৃতিবাজির পাশাপাশি কিভাবে ক্ষমতাসীন বামেরা নিজেদের খাসতালুকে সরকারি কোষাগার এবং সাধারণ মানুষের সম্পদের বিনিময়েই পুঁজি টানতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।      

বসু জমানা 
হ্যাঁ, শুরুটা জ্যোতিবাবুর আমলেই, তবে দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে। ৮৪-৮৫ সালে প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের ছাড়পত্র পার্টির কলকাতা কংগ্রেসে অনুমোদন পায়।  সে কথা উল্লেখ করে  দলিলে বলা হয়েছে কর্মসংস্থানমুখী শিল্পের প্রয়োজন অনুভূত হয় দলে ও  সরকারে। 'বেসরকারী পুঁজির সাহায্য নিয়ে শিল্পায়ন সেই অবস্থায় রণকৌশলগত চাহিদা হিসাবে উপস্থিত হয়েছিল।' কিন্তু পুঁজির পাল্টা কৌশলগুলির মুল্যায়নে দলের তাগিদের কোনো ছাপ তো দলিলে নেই।  '৯১-র রাও সরকারের মনমোহিনী উদার অর্থনীতি ঘোষণার তিন বছরের মধ্যে বসু-নীতিতে দেশী-বিদেশী কর্পোরেট পুঁজিকে আমন্ত্রনের পাশাপাশি 'রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকায় জোর' থাকার প্রতিশ্রুতি ছিল। ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের পুনরুজ্জীবনের কথাও।  কিন্তু বাস্তবে আমরা তেমন উদ্যোগ দেখিনি।  'বিনিয়োগের প্রশ্নে অন্যতম বাধা' পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে শিল্পপতিদের 'পূর্ব ধারণা' কাটাতে চটকল, চা বাগিচা, টেক্সটাইল সহ নানা পুরনো শিল্পে শ্রমিকদের বকেয়া মাইনে, পিএফ-গ্রাচুইটির কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী মালিকদের বিরুদ্ধে কোনও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একদা জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনের জন্য পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিকরা নানা ভাবে আক্রান্ত হয়েও আত্মরক্ষার লড়াইতেও ক্রমশ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন মূলত: শাসক দলের চাপে। উল্টে সরকার দিনে দিনে রুগ্ন-বন্ধ কলকারখানার জমিতে শপিং মল- আবাসন প্রকল্প করার পথ সুগম করেছে। কিন্তু জমি-বেচা টাকা কারখানায় ফিরে আসা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেয়নি। রুগ্ন-বন্ধ কারখানা বা  'সিজনাল' বন্ধের কবলে মিলের শ্রমিকদের অনাহার-আত্মঘাত আর সরকারি ভাতার শিকে ছেড়ে অপেক্ষাই হাহুতাশের বদলে  আপন ভাগ্য জয়ের নিজস্ব কোনো  উদ্যোগকে মদত দেয়নি।  'সংগ্রামের হাতিয়ার বামফ্রন্ট সরকার' স্রেফ স্লোগানই রয়ে গেছে। এক সময় স্লোগানটিও বদলে গেছে। সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় 'উন্নয়নের' হাতিয়ার।   

এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিই কানোরিয়া জুট মিলের শ্রমিকদের আন্দোলন। ফেরেববাজ মালিকদের খুশিমতো  মিল বন্ধের বিরুদ্ধে স্রেফ ধরনা- মিছিলে আটকে না থেকে কারখানার দখল নেওয়ার পর কানোরিয়ার সংগ্রামী শ্রমিক সংগঠনের ভাবনা ছিল মালিকপক্ষ লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে শ্রমিকদের পাওনাগন্ডা মেরে দেওয়া অব্যাহত রাখলে এবার শ্রমিক উদ্যোগেই কারখানা চালানোর চেষ্টা হবে। দেশে-বিদেশে এহেন উদাহরণ আছে। পুঁজির সর্বগ্রাসী প্রতিপত্তির ঘেরাটোপে এহেন শ্রমিক- উদ্যোগ আদৌ সফল হতো কিনা, হলে কত দূর পর্যন্ত --এসব পরের কথা। তবু প্রস্তাবটি নিয়ে প্রস্তুতির সময় কানোরিয়া ছাপিয়ে অন্য কিছু  মিলে এবং নাগরিক সমাজের একাংশে আলোড়ন তৈরী হয়। হয়তো রাজ্যের বন্ধ কলকারখানার শ্রমিকদের জীবনে এ এক নতুন আলোর দিশা হতে পারত যার রাজনৈতিক -সামাজিক অভিঘাত হতো সুদূরপ্রসারী। কিন্তু জ্যোতি বসুর সরকার এবং তার দল ও সিটু এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে সরকারনির্ভরতা, বামপন্থী বুলিসর্বস্বতা আর নিশ্চেষ্টতার চেনা ছকে ফিরিয়ে দিতে মাঠে নেমে পড়ে। কৃষি আর কৃষকের সংকটের মোকাবিলায় যারা সমবায় ও অন্যতর পথে হাঁটেন নি, তারা রুগ্ন-বন্ধ শিল্প এবং তার শ্রমিকদেরও  প্রথাগত বাম ভাবনার বাইরে যেতে দেননি।      

চীনা মডেলের অনুকরণ                                                                       
নতুন শিল্পে তথ্যপ্রযুক্তি, পেট্রোকেমিকালস, ইস্পাত, লেদার, ফুড প্রসেসিং, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদিতে গুরুত্ব দেওয়া হল। কিন্তু এখানেও সি পি এম বা বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পভাবনায় চীন ব্যতিরেকে সমসাময়িক বিশ্বের বামপন্থী চিন্তাচেতনার ছাপ দেখা গেল না। মার্কিন তথ্য-প্রযুক্তি শিল্পে আউটসোর্সিং-এর সুবাদে ভারতে আই টি সেক্টরে কিছু কর্মসংস্থান হয়েছে বটে । কিন্তু দেশের ইংরেজিশিক্ষিত যুব প্রজম্মের সস্তা শ্রমের বিনিময়ে এই ডিজিটাল বুদবুদ কতদিন টিঁকবে, সেটা বামপন্থীরাও ভেবে দেখেননি। কেননা চীনে দেং-পরবর্তী শিল্পায়ন-উন্নয়নের ময়দানবী মডেলটির চোখধাঁধানো সাফল্যে অভিভূত হয়ে তার সামাজিক-অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অভিঘাতের ভালো-মন্দ বিচার কার্যত শিকেয় তুলে সেটির অনুকরণের পক্ষে দলের ভিতর চাপ বাড়ছিল। দেশের অন্যত্র বামপন্থীদের বিকাশের রাস্তা যত রুদ্ধ হচ্ছিল, ততই চিনা মডেলে পার্টি ও সরকারের হাতে রাশ রেখেই ভঙ্গবঙ্গে পুঁজিবাদী উন্নয়নের মর্ত্যস্বর্গের নির্মানের মাধ্যমে নয়ের দশকের স্থিতাবস্থা কাটিয়ে ক্ষমতার আয়ু বাড়ানোর তাড়না প্রবল হয়। একারণেই একুশ শতকের গোড়াতেই প্রবল দুষণকারী ও শ্রমিক শোষণকারী স্পঞ্জ আয়রনের কারখানা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে।  বেজিং অলিম্পিক্স-এর আগে ইস্পাত শিল্পে চাহিদায় উর্ধ্বগতি এবং কেন্দ্রীয় নীতির কল্যাণে খনিজ সম্পদে গর্ভবতী ঝাড়খন্ড ও বৃহত্তর পূর্ব ভারতের খনি- জমিতে দেশী-বিদেশী প্রাইভেট সেক্টর-এর মৃগয়া ক্ষেত্রের কাছাকাছি থাকার সুবিধার জেরে পশ্চিমবঙ্গে ইস্পাত প্রকল্প গড়বার আগ্রহ বাড়লো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। উন্নত দেশগুলিতে পরিবেশ ও অনান্য কারণে নানা বিধিনিষেধের বেড়াজাল পেরিয়ে পুঁজি ও প্রযুক্তির নতুন বিনিয়োগের জমি খুঁজছিল পেট্রোকেমিকালস শিল্পের মালিকরাও। বন্দর ও অন্যন্য পরিকাঠামোর পাশাপাশি এই শিল্পের মতই নানা সেক্টর থেকে সরকারি উদ্যোগে কৃষিজমি দখল, প্রায় নিখরচায় জমির দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত, শিল্পের জন্য অধিগৃহীত জমির বড় অংশ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ব্যবহারের সুযোগ, নামমাত্র সুদে সরকারি ঋণ, বিপুল করছাড় -- এককথায়  মাছের তেলে মাছ ভাজার যাবতীয় ব্যবস্থাদির দাবি ওঠে।  সেই সঙ্গে  শিল্প-তালুক্গুলিকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের তকমা দিয়ে কর্পোরেট জমিদারী কায়েমের পাকা বন্দোবস্তও।  এই গোটা পরিকল্পনাটার প্রায় পুরোটাই উঠে এসেছে চিনের মাটি থেকে। তথাকথিত বাজারভিত্তিক সমাজতন্ত্রের নামে, এক দেশে দুই অর্থনীতির নামে হংকং লাগোয়া এবং অন্যান্য কিছু অঞ্চলে দেশী- বিদেশী পুঁজি টানতে কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে সেই জমিতে স্পেশাল ইকনমিক জোন বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে।  চিনের গ্রামীন সস্তা শ্রমশক্তি, বিশেষত গরীব মেয়েদের সস্তাতর শ্রম নিংড়ে চিনের শাসক কমিউনিস্টরা মার্কস-কথিত পুঁজির আদিম পুঞ্জীভবনের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় সিলমোহর লাগিয়েছেন।  

সর্বভারতীয় রাষ্ট্রক্ষমতার থেকে বহু দূরে থেকেও সি পি এম পশ্চিমবঙ্গে চিনের অনুকরণ করার জন্য কতদূর উদ্দণ্ড হয়ে উঠেছিল তা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে বুদ্ধবাবু ও তার শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেনের কথায় বারংবার মূর্ত হয়েছে। এই যুগলবন্দী পুঁজির স্বর্গ চীনের একটুকরো পশ্চিম বঙ্গে কায়েম করার বাসনায় টাটা- সালেমদের মনোমতো জমি,করছাড় এবং অন্যবিধ তুষ্টিসাধনে মত্ত হয়ে বিনিয়োগ টানায় বিভোর হয়ে গেলেন। শুধু তাই নয়, কৃষকদের প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী বলে অভিহিত করার পাশাপাশি গুজরাতে মোদী-মডেলের অনুকরণে উদগ্র হয়ে ওঠেন।  এতটাই যে ২০০৬ সালে কেন্দ্র এস ই জেড আইন আনার তিন বছর আগে রাজ্য বিধানসভায় এস ই জেড আইন পাশ করানো হয়। পরে  কেন্দ্রীয় আইনেও সমর্থন জানায়  সিপিএম এবং তার সহযোগীরা। বর্তমান দলিলে এই দুটি অপকান্ডের উল্লেখ পর্যন্ত নেই। উল্টে দাবি করা হয়েছে, 'নির্বিচারে ও নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে সেজ অনুমোদনের আমরা বিরোধিতা করেছি প্রথম থেকেই। 'জমির ফাটকাবাজি, রিয়েল এস্টেটের বেনিয়মি ব্যবসা এবং শ্রমিকদের জন্য যেমন ইচ্ছা ছাঁটাইয়ের নীতির প্রয়োগ' দল মানেনি। কিন্তু রাজ্যবাসী হিসাবে আমরা প্রকৃত বাস্তবতা জানি। এই পর্বেই ফ্রন্টে ও দলের ভিতরে প্রশ্ন ওঠে কর্পোরেট পুঁজির এহেন মুক্তকচ্ছ আবাহনই যদি কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের একমাত্র উপায় হয় তাহলে কর্পোরেট-বান্ধব নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বুদ্ধবাবুর নীতির মৌলিক পার্থক্য কোথায়? বস্তুত: রাজ্যে মোদীর গুজরাটের মত 'রাজনীতিহীন উন্নয়নের' প্রধান দুই প্রবক্তা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আর আনন্দবাজারের মালিক-সম্পাদক অভীক সরকার সেই সময় থেকেই। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জেরে যখন নিজেদের খাস তালুক আর অন্যত্র দুরকম নীতির কল্যাণে ভিতরে-বাইরে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিন্দিত ও বিড়ম্বিত, তখন রাজ্যের এস সি জেড নীতিতে শিল্পের জন্য  অধিগৃহীত জমির অপব্যবহার আটকাতে কিছু কড়াকড়ি করা হয়। ওই পর্বেই কৃষিপণ্যের পাইকারী ব্যবসা, ভোগ্যপন্যের খুচরো ব্যবসায় দেশী-বিদেশী কর্পোরেট পুঁজি এবং শপিং মল নির্মাণ ইত্যাদি প্রশ্নে দলের কেন্দ্রীয় নীতি আর রাজ্য সরকারের নীতির প্রবল টানাপড়েন আমরা দেখেছি। তেলে-জলে মিশ খাওয়ানোর এই প্রকল্পে রাজ্যে শাসকদের বিনিয়োগ-বান্ধব ইমেজ ও বাকি দেশে বামপন্থী বিরোধীর ভাবমূর্তি রক্ষার আপ্রাণ প্রয়াস চলেছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। যে কৃষকের সমর্থনে গ্রামবাংলায় দলের এতকালের মৌরসীপাট্টা, তাদের সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থন খুইয়ে ক্ষমতা থেকে হঠে যেতে বাধ্য হল বামেরা।  

উন্নয়নের মডেল বদলায়নি   
এ সত্ত্বেও জমি অধিগ্রহণ প্রশ্নে ফ্রন্ট ও দলের ভিতরে ওঠা সমালোচনার প্রতিফলন এবং আন্তরিক আত্মসমীক্ষার কোনো লক্ষণ বর্তমান দলিলে নেই। বরং পুরনো যুক্তি খাড়া করে বলা হয়েছে: শিল্পায়নের জন্য  প্রস্তাবিত জমি অধিগ্রহণ সবটা করলেও রাজ্যের মোট কৃষি জমির মাত্র এক শতাংশ জমি যেত।  খাদ্য নিরাপত্তার বিপদের ন্যূনতম সম্ভাবনা ছিল না।  শুধু তাই নয়, সরকারি ও বেসরকারী প্রকল্প, গ্রামীন পরিকাঠামো নির্মান ও ভারী শিল্প ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য ইচ্ছাকৃত ভাবে গুলিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় জমি দানের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে  সহমতের ভিত্তিতে জমি পেতে সরকারের কোনো সমস্যা হয় নি।   সিঙ্গুরেও নাকি প্রায় ৮৩ শতাংশ জমি কৃষকরা স্বেচ্ছায় অধিগ্রহণ করতে দেয়। রাজ্যবাসীর স্মৃতিতে পুলিশ-প্রশাসন-পার্টি ক্যাডার সন্মিলিত বাহিনী নামিয়ে সেই স্বেচ্ছাসন্মতি  নির্মানের প্রক্রিয়াটি মনে  আছে। দলিলে সেই প্রশ্নে কোনো আত্মসমালোচনা নেই আজও। উল্টে পুরনো দাবিটিই উঠে এসেছে যে যারা সন্মতি দেননি তারাও  সবাই 'অনিচ্ছুক' ছিলেন না। টাটার কারখানা গুজরাতে চলে যাবার জেরে 'রাজ্যে বিনিয়োগের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্নচিন্হের জন্ম' দিল বলে বিরোধীদেরই দোষারোপ করা হয়েছে। নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে অবশ্য স্থানীয় মানুষের বিরুদ্ধ মনোভাব তৈরি দায়টা 'স্থানীয় নেতৃত্ত্বের একাংশের (পড়ুন, লক্ষ্মণ শেঠদের) অপ্রয়োজনীয় তৎরতা'র উপরেই বর্তেছে। 

শিল্পায়ন ও জমি অধিগ্রহণ প্রশ্নে বুদ্ধবাবুর নেতৃত্বে সরকার ও  দলের ক্ষমতাসীনেরা পুরনো গান গাইলেও দলিলে ইতিউতি কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু তার দায় সরকার ও দলের মাথাদের উপরে বর্তায়নি। বলা হয়েছে: সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের পরিস্থিতির পার্থক্য ছিল। তবে  'কৃষিজীবীদের জমি সম্পর্কে চেতনাকে সম্যক উপলব্ধিতে আনা হয়নি।' কেননা, ' মনে রাখতেই হবে যে জমির বিষয়টি কেবল ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের বিষয় নয়, কৃষকের কাছে তা খুবই সংবেদনশীল বিষয়। ' এছাড়া  'সাধারণ মানুষের স্বার্থেই শিল্পায়ন দরকার' এটা  তাদের বোঝানোয় 'যত্ন' নিতে এবং তাদের সঙ্গে  'নিবিড়  সম্পর্ক তৈরী করে পরিকাঠামো ও শিল্প প্রসারে' এগোন জরুরি'।  আবার একই সঙ্গে ধোঁয়াটে  দাবি: ' সাধারণ ভাবে শহরের মানুষ শিল্পায়নের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু একাংশের মানুষের মনে হয়ছিল, সরকারের জমি অধিগ্রহণ কৃষকের স্বার্থবিরোধী।'  তবে এই প্রশ্নে 'সরকার-বিরোধী মনোভাব ও ব্যাপক বিভ্রান্তি' সৃষ্টির দায় চেপেছে তৃনমূল-মাওবাদী- সুশীল সমাজ সহ বিরোধীদের  'রামধনু জোটের' উপরে। কোনো সন্দেহ নেই তৃনমূল ও অন্য বিরোধীরা ঘোলা জলে মাছ ধরেছে। ক্ষমতায় না থাকলে সেটা সিপিএম বা বামেরা করেছে বা করছে ।

সংসদীয় রাজনীতির এটাই দস্তুর। কিছু দলের এতদিনের শেকড় এভাবে উপরে যাওয়ার ব্যাখ্যা এতে মেলে না। সংকটের উৎস আরও গভীরে। একটি জাতি-রাষ্ট্রের নিও-লিবারেল কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিস্পর্ধায় বিনিয়োগযোগ্য স্থানীয় বা প্রান্তীয় পুঁজির অভাবে রিক্ত অঙ্গরাজ্যে ক্ষমতাসীন বামপন্থীদের শিল্পায়ন-ভাবনা কেমন হবে, তার চেয়ে বড় কথা,  চীন বা মার্কিন মডেলের শিল্পায়ন আদৌ বেকারের কর্মসংস্থান বা ছিন্নমূল কৃষিজীবীর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা  করতে পারবে কিনা, এর অনুসারী নগরায়ন- বৃহত্তর পরিকাঠামো উন্নয়নের নীল নকশা ও সহগামী ভোগবাদী সংস্কৃতি গ্রাম-নগরের জনজীবন, প্রকৃতিলগ্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলি ও পরিবেশ ঘিরে ইতিমধ্যেই যে চক্রব্যূহ সাজিয়েছে তার মোকাবিলা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন বামপন্থীরা দেশের নানা রাজ্যে কী ভাবে করবে-- এনিয়ে সি পি এমের রাজ্য বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনো দিশা হাজির করেননি। কেন না, কিন্তু দলিলের সুর থেকে স্পষ্ট, উন্নয়ন-শিল্পায়নের মূল  মডেলটি নিয়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সাত বছর পরেও আলিমুদ্দিনে কোনোই দ্বন্দ্ব-ধন্দ নেই। সমস্যার মূলে স্রেফ জনসংযোগের সমস্যা আর বিরোধীদের উস্কানি। 'অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা: বিকল্পের সন্ধানে' শীর্ষক অংশে বলা হচ্ছে: 'ভূমিসংস্কার ও গ্রামোন্নয়নের কর্মসূচি এক ধরনের স্থিতাবস্থায় পৌঁছেছিল। শিল্পায়ন ছাড়া কী হবে কার্যকর বিকল্প তা সব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট  করা যায়নি।" কেন করা যায়নি ? আদৌ কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি?  বরং চলতি মডেলের শিল্পায়নকেই যে আর্দশ জ্ঞানে আঁকড়ে ধরে শেষ দিকের বাম সরকার, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরবর্তী মন্তব্যে:  'কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের উদ্যোগে এক দশকের মতো সময়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহনের প্রশ্নে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে দুটি ব্যতিক্রমী ঘটনা আমাদের শিল্পায়নের উদ্যোগকে থমকে দেয়।'  তাই? সিঙ্গুর- নন্দীগ্রামের আগে হলদিয়া বন্দর ও পেট্রোকেমিক্যল-এর জন্য চাষের জমি অধিগ্রহণ করে হলদিয়া শিল্পাঞ্চলের জন্ম। সমসাময়িক রাজারহাট উপনগরী প্রকল্প একই ভাবে ছলে-বলে-কৌশলে চাষের জমি জমি দখল করে। একই ভাবে তার আগে হয়েছে সল্ট লেকের ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স। রাজ্যের নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যার তুলনায় কত ছেলেমেয়ের চাকরি হয়েছে এই দুই শিল্পাঞ্চলে? জমিহারাদের পুনর্বাসন, চাকরি-বাকরি-রুটি-রুজির সুষ্টু ব্যবস্থা কতদূর হয়েছে? এ নিয়ে কোনো আন্তরিক সমীক্ষা করেছে কি বসু ও ভট্টাচার্য সরকার? একেবারেই নয়। বরং সত্য গোপনের সব রকমের চেষ্টা চালিয়েছে। দলিলে শেষ পর্যন্ত ভট্টাচার্য জমানারই জয়গান: ' আমাদের গৃহীত গ্রামোন্নয়ন নীতিসমূহের পুন:পরীক্ষাও জরুরি। (তবে) শিল্পায়নের নীতি ঠিক ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহনকে কেন্দ্র করে যে সমস্যার মুখোমুখি হাতে হয়েছে তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।'  সেই শিক্ষাগুলি যে উন্নয়ন-শিল্পায়নের মূল মডেলটিকে প্রশ্ন করার ধারেকাছে নেই, তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট।                        

বিকল্পের সন্ধান কোথায়? 
তবু মিথ্যাচারের ধারাবাহিকতায় দাবি করা হয়েছে: " একটি পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে আমরা কৃষি শিল্প শিক্ষা স্বাস্থ্য সমস্ত ক্ষেত্রেই বিকল্পের সন্ধান করেছি।" সত্যি?  এই দলিলেই গোড়ার দিকে স্বীকার করা হয়েছে, কৃষিতে স্থিতাবস্থা কাটাতে সমবায় ইত্যাদির উদ্যোগ নেওয়া যায়নি। অন্যদিকে আমরা  জানি ম্যাকিন্সের পরামর্শে  কি ভাবে চুক্তিচাষ, কৃষিপন্যের ব্যবসায় বিদেশী মেট্রো-ক্যারিফুর, পেপসি-ফ্রিটলে, নানা বীজ কোম্পানি ও দেশী  আম্বানিদের কন্ঠলগ্ন হয় বাম সরকার। শিল্পে বিকল্পের সন্ধান কি হয়েছে তা পরিষ্কার। শিক্ষা ক্ষেত্রে এটা ঘটনা বাম সরকারের উদ্যোগে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি বেড়েছে। তবে  প্রাথমিকে ইংরেজি বিলোপের অনেক পর জনমতের চাপে তা ফেরানো, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার দলীয়করণ ছাড়া মনে রাখার মতো শিক্ষার মর্মবস্তু ও পদ্ধতি-প্রকরণে প্রকৃত বিকল্পের সন্ধান কোথায় হয়েছে ? উচ্চশিক্ষায় বেসরকারী বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোয় ব্যাঙের ছাতার মতো ইন্জিনিয়ারিং ও মেডিকাল কলেজ হয়েছে, যাদের পরিকাঠামো ও শিক্ষার মান নিয়ে হাজার প্রশ্ন। স্বাস্থ্যের কথা যত কম বলা যায় তত ভালো। সরকারি হেলথ সেন্টার থেকে হাসপাতালগুলির দফা রফা সেরে বেসরকারী হাতুড়ে, নার্সিং হোম আর হাসপাতালের রমরমাকে স্বাগত জানিয়েছে বাম ফ্রন্ট সরকার।          

বাম শাসনের শেষ পর্বে জঙ্গলমহলের পরিস্থিতি নিয়েও কোনো আত্মসমালোচনা নেই। একদা আদিবাসীদের মধ্যে ভালো প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বামেদের জমি হারানোর জন্য তৃনমূল-মাওবাদী আঁতাতকেই দায়ী করা হয়েছে। 'রাজনৈতিক মোকাবিলার পাশাপাশি প্রশাসনিক উদ্যোগ' চালানো সত্ত্বেও কেন ' আমাদের জনবিচ্ছিন্নতা তৈরী হয়', এনিয়ে নিজেদের কৃতকর্মের দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করেননি বুদ্ধবাবু-বিমানবাবুরা।

দলতন্ত্র: ভাবের ঘরে চুরি অব্যাহত   
দলের সঙ্গে 'সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব' ব্যাখ্যায়  'শিক্ষাক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ', 'স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থায় কিছু কিছু জায়গায় শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির বদলে সংকীর্ণ দলীয় মানসিকতার বিস্তার , স্বজনপোষণ এবং কম হলেও দুর্নীতি, অংশগ্রহণ মূলক গণতন্ত্রকে বিকশিত করার মত গণ-উদ্যোগে জনবিচ্ছিন্নতা', পঞ্চায়েতে 'শেষের দিকে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক প্রবনতা' তথা 'গ্রামাঞ্চলে ও শহরাঞ্চলে কিছু কিছু জায়গায় নাগরিক জীবনে আধিপত্যবাদ এবং অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ' নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে।  বিপরীতে বিকল্পের সন্ধানে 'কেরলের গণবন্টন ব্যবস্থা, গুজরাতের আমূল সমবায়, তামিলনাড়ুর মিড দে মিল , খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জন কল্যাণমূলক কর্মসূচি থেকে শেখায় সরকারি অনীহা' এবং মানুষের উদ্ভাবন ক্ষমতাকে ছোট করে দেখার প্রবনতা'  ইত্যাদির উল্লেখ করা হয়েছে । রয়েছে শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের জন্য 'প্রভূত পরিমাণ সুবিধার ব্যবস্থা' সত্বেও তাদের মধ্যে কর্মসংস্কৃতির নতুন ধারা সৃষ্টিতে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।  কিন্তু এর নেপথ্যে যে পাইয়ে  দেওয়ার রাজনীতি, দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে ক্ষমতার প্রাসাদ বিতরণের রাজনীতি তাকে ঘিরে কোনো মৌল আত্মানুসন্ধান নেই।  পশ্চিমবঙ্গের সমাজ-রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যে সর্বগ্রাসী দলদাসতন্ত্রের  সাক্ষী আমরা থেকেছি, দলিলে না তার ব্যাপ্তি স্বীকৃত, না রয়েছে তার মতাদর্শগত উৎস  চিন্হিত করে দলের বদলে শ্রেণী রাজনীতির পথে ফেরার দিশার সন্ধান।     

মানবাধিকার বামফ্রন্ট: বাম সংবেদনের ধারাবাহিক অবক্ষয়  
এই দলিলে  মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার,  আমজনতার এবং বিরোধী দল ও ব্যক্তিদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে বামফ্রন্ট সরকারের রেকর্ড নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করা  হয়নি।  সাতাত্তরে প্রথম বাম সরকারের প্রথম বৈঠকেই নকশালপন্থী ও কংগ্রেসী  সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দাবি করা হয়েছে 'গণতান্ত্রিক পরিমন্ডল'কে 'প্রাতিষ্ঠানিক' চেহারা দেওয়া হয়। শ্রমিক আন্দোলনে বা ধর্মঘট ভাঙ্গতে পুলিশ পাঠানো হয়নি। বিরোধীদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনকে বলপূর্বক দমন করা হয়নি। রাষ্ট্র, বিশেষ করে সরকার, সাশক দল ও তার বশবর্তী পুলিশ-প্রশাসনের নানা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার তথা শাসিতের গণতন্ত্রের সীমা সম্পর্কে শাসক ও বিরোধী দলগুলি এবং দলের বাইরের  'মানুষ'দের ধ্যানধারণা ও অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাক দীর্ঘ বাম-শাসনে কমেনি, বরং বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিক পর্যালোচনায় যেটা চোখে পড়ে, তা হল বামপন্থী মূল্যবোধ ও সংবেদনের ধারাবাহিক অবক্ষয়। সময়ের পরিহাস, তা চূড়ান্ত রূপ পায় সংবেদনশীলতার প্রতিমূর্তি  হিসাবে ভক্তমহলে  পরিচিত জ্যোতি বসুর উত্তরাধিকারীর আমলে।  

যত দূর মনে পড়ছে ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট আমলে উপমুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী জ্যোতি বসুর অধীন পুলিশের গুলিচালনায় নকশালবাড়িতে নারী-পুরুষ কৃষক, বর্গাদারের হত্যাকান্ডের পর সিপিএম রাজ্য কমিটি তার নিন্দা করেছিল। কিন্তু চার দশক পরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জমানায় ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে একইভাবে পুলিশী গুলিতে নারী-পুরুষ কৃষকদের হত্যার কোনো নিন্দাবাদ আমরা দলের কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্বের থেকে শুনিনি ঘটনার সাত বছর পরেও। নকশালবাড়ি ও নন্দীগ্রাম-- শাসক দলের তরফে যথাক্রমে দলের 'উগ্রপন্থী ও বিপথগামী ' অংশ এবং  রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল কৃষকদের খেপিয়ে তুলে পুলিশকে আক্রমণে উস্কানি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে।কিন্তু চার দশক আগে শ্রমিক-কৃষকের নামে ক্ষমতাভোগের প্রথম পর্বে দলের নেতৃত্বের মধ্যে যেটুকু দায়বোধ বা শ্রমজীবীদের উপরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে যেটুকু অপরাধবোধ বেঁচেছিল, অন্তপর্বে সেটুকুও হারিয়ে যায় নাট্যকার-শাসকের পৌরোহিত্যে পুঁজি-বন্দনার সাড়ম্বর উদ্যোগে। অবশ্য অনেকে বলতে পারেন, বাম ফ্রন্ট সরকারের মধুচন্দ্রিমা পর্বে বসুর নির্দেশে সুন্দরবনের মরিচঝাঁপি দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া নিম্নবর্গীয় বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুলিশী বেড়াজালে ঘিরে ডুবিয়ে-পিটিয়ে-আগুন লাগিয়ে  বিতাড়নের আয়োজনেই সেই প্রথম যুগের আড় ভেঙ্গেছেন সিপি এম নেতৃত্ব।                                   

ধর্মনিরপেক্ষতা ও দুই মৌলবাদের সঙ্গে সমঝোতা
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে সারা দেশের প্রেক্ষিতে সামগ্রিকভাবে বাম-শাসন পর্বকে অবশ্যই সাধুবাদ দিতে হবে। কিন্তু সেই কুলধর্মের প্রতি নিষ্ঠাতেও ক্ষয়ের চিন্হ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর খোদ কলকাতার দুই প্রান্তে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুন জ্বলে ওঠায়, বিশেষ করে বাম সমর্থক- কর্মীদের একাংশের ধর্মীয় বিভাজনে। গুজরাতে মোদীর দলের আয়োজনে ও সরকারের সমর্থনে ভয়ংকর মুসলিম নিধনের পর্বে সিপিএমের ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থানে যে অধ:পতন সূচিত হয় , বিজেপির নেতৃত্বে এন ডি এ-এর প্রথম শাসনকালে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ ও মাদ্রাসা প্রশ্নে আদবানি- বুদ্ধদেব সমাপতনে তা হিন্দুত্ববাদীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান সহনশীলতার বৃত্তটিকে পূর্ণ করে। বিপরীতে ক্ষমতায় টিঁকে থাকার প্রয়োজনেই ইসলামিক মৌলবাদীদের সঙ্গে আপসের নির্লজ্জতা প্রকট হয়ে ওঠে সরকারি উদ্যোগে তসলিমা নাসরিনের তড়িঘড়ি বিতাড়নে। দলিলে এসব প্রশ্নে কোনো আত্মসমালোচনা নেই. তবে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বামেদের বিচ্ছিন্নতার সমীক্ষায় কিঞ্চিত সততার পরিচয় রয়েছে। বলা হয়েছে: ' আসলে ষাটের দশক থেকে নিরাপত্তাজনিত বিষয়কে গুরুত্ব সহকারে আমরা বুঝলাম, নব্বইয়ের দশকের পপরবর্তী সময়ে 'পরিচয়' ও  'অংশিদারিত্ব'-র  যে দাবি উঠে আসে সে বিষয়ে যথাযথ অনুসন্ধান সাপেক্ষে কর্মসূচি নির্ধারণে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতা দেখা দেয়।

নারীদের সম্পর্কে চার লাইন খরচ করে তাদের অধিকার ও মর্যাদারক্ষা এবং ক্ষমতায়নে বাম সরকারের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।  কিন্তু বানতলা থেকে ধানতলা মহিলাদের উপর ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়দানের ঘটনাগুলিকে দলীয় বা পুলিশী আয়নায় দেখার অভ্যাস,  'ছোট ঘটনা, সাজানো ঘটনা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা, বিরোধীদের চক্রান্ত ' ইত্যাকার অপবাদ দান ও নস্যাৎ করার যে নির্লজ্জ অমানবিকতার জন্য আজ মমতা বন্দোপাধায় ও তার দল কুখ্যাত, তার সূত্রপাত বাম শিরোমণিদের হাতেই। গ্রামে-শহরে দলের অঞ্চলপতিদের দরবার ও স্থানীয় সমাজপতিদের চন্ডীমন্ডপে আক্রান্ত মহিলাদের  চরিত্রবিচারের ঐতিহ্য নির্মিত হয় এভাবেই। শেষ পর্বে বুদ্ধবাবুর 'মরুদ্যান' সম্পর্কিত আত্মশ্লাঘার বিজ্ঞাপনের ধারাবাহিকতাতেই একদা নির্যাতিতা নারীর সমব্যথী মমতার আজকের শাসকীয় অস্বীকার-- ' টোটালটাই মিথ্যে।' দলিলে এনিয়ে কোনও বিবেকী পশ্চাদবলোকন নেই।                     

শেষের দিনগুলো 
 কর্পোরেটনির্ভর শিল্পায়ন-নগরায়নের জাদু-কার্পেটে উড়ে 'রিসার্জেন্ট ওয়েস্টবেঙ্গল'-এর  মোহিনী ছবি আঁকার দিনগুলোয় প্রদীপের তলায় অন্ধকার দ্রুত জমছিল। দলিলের আক্ষেপ: ' গঞ্জগুলির সংখ্যাবৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, গ্রাম ও শহরে কর্মসংস্থান সমস্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, এবং উদারনীতির বহুমাত্রিক প্রভাবে সমাজ ও রাজনীতিতে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের ছাপ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল। ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের স্বার্থে ক্রমবর্ধমান লুম্পেন সর্বহারাদের ব্যবহার করে গ্রাম, গঞ্জ ও শহরের নব্যধনীরা প্রত্যাঘাতের জন্য তৈরী হচ্ছিল। বাইরের শক্তিও সক্রিয় ছিল। পুরুলিয়ায় অস্ত্র বর্ষণ থেকে শুরু করে  কংগ্রেসের তথাকথিত পাঁশকুড়া লাইন ইত্যাদি বামফ্রন্ট বিরোধী চক্রান্ত গুলি সাময়িকভাবে পরাস্ত হলেও শেষ পর্যন্ত রামধনু জোট  গড়ে তুলতে সফল হয়।'    

কেউ বাম সরকারের পতনে অতীব ব্যথিত হলেও একে আত্মছলনা অথবা অর্ধসত্য কথনের অভ্যাসের বেশি বলা মুস্কিল।  

বাস্তবতা আমাদের চোখে অন্য রকম ভাবে ধারা পড়েছে।  সীমিত ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আত্মপ্রসাদের পর্বে দলীয় ক্ষমতার লৌহবাসর নির্মানে তন্নিষ্ঠ সিপিএম নেতৃত্ত্ব ওই সময় দলের ন্যাওটা নব্যধনীদের ব্যাপক তোল্লাই দিয়েছে। গ্রামীন সমৃদ্ধির পোস্টার বয় হয়ে ওঠে তারা। সে সময় দলের সুবেদার, মনসবদাররা এদের তহশিলদার, গোমস্তা নিয়োগের সময় খেয়াল রাখেননি এদের সুবাদেই দলের ভিতরে-বাইরে উদারনীতিবাদের কালনাগিনীরা ঢুকছে। প্রথম পর্বে  গরিবদের ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতিটা  একসময় ফুরিয়ে গেল এবং নব্যধনীদের পোয়া বারো হলো। লুম্পেনরা চিরকাল ক্ষমতার পক্ষভুক্ত। দীর্ঘজীবি বাম শাসনে বেনোজল ঢোকার রাস্তা যত বেড়েছে, নির্বাচনের আগে পরে শাসকীয় সন্ত্রাসের প্রয়োজন যত বেড়েছে, ততই অপরাধীরা দলে আশ্রয় পেয়েছে। উদার অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নিয়মেই রাজনৈতিক আনুগত্য দলের নিয়ন্ত্রনের বাইরে বাজারের রাজনীতি, রাজনীতির বাজারের পণ্য হয়ে উঠল।  নব্য ধনী, লুম্পেনদের সঙ্গে অনুগ্রহ বিতরণের খেলায় বঞ্চিত গরিবরাও পরিবর্তনের ঘুটি হয়ে ওঠে। স্বখাত সলিলেই ডুবেছে সিপি এম তথা বামফ্রন্ট সরকার। জমি-প্রশ্নে বুদ্ধদেব সরকার-এর কর্পোরেট-প্রীতি কফিনে শেষ পেরেক।  এই সত্যিটা তখন দলের ভিতরে কেউ কেউ এবং ফ্রন্টের শরিকরা বারংবার বলেছেন। কিন্তু দলিলে সেই ঘরোয়া সমালোচনার উল্লেখ নেই। ফলে গোটা উদ্যোগটিই প্রসাধনী সততার বিজ্ঞাপন মাত্রে পর্যবসিত। এহেন আত্মসমীক্ষার ভড়ংরাজিতে দলের ভিতরে বাইরে ভবি ভুলবে বলে মনে করে থাকলে আলিমুদ্দিনের গর্ভগৃহ বাসীরা মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন।                          

পরিশিষ্ট
সিপিএম নেতৃত্বের বিলম্বিত বোধোদয়ের আশা থাকুক না থাকুক, অপরাপর বামপন্থীদের মধ্যে নতুন ভাবনার তাগিদ কতটা, এনিয়ে ধন্দ রয়েছে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্ব থেকে শিল্পায়ন-উন্নয়নের সরকারি মডেল ঘিরে চলা প্রতর্কগুলিতে সিপিএমের সমালোচনা যত প্রাধান্য পেয়েছে, বিকল্প বামপন্থার সন্ধান তার এক আনাও পায়নি । সহিংস বা অহিংস পথে দেশে বা রাজ্যে ক্ষমতায় এলে সিপিএম-বিরোধী বামেরা কোন পথে হাঁটবেন, তাদের কৃষি ও শিল্পনীতি, কর্মসংস্থাননীতি কী হবে তার কোনো স্বচ্ছ ও সংহত নীতিমালা আমরা এখনো দেখতে পাইনি। প্রথাগত মার্কসবাদী ঘরানায় উৎপাদনব্যবস্থা তথা কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পসভ্যতা বিকাশের যে পর্বান্তর বা স্তরান্তর স্বীকৃত, তারই দোহাই পেড়ে ভূমিসংস্কার-পরবর্তী ভারী শিল্পের পথে যাত্রা তথা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ন্যায্যতা  উৎপাদনের চেষ্টা করেছেন সিপিএম নেতৃত্ব। সোভিয়েত ও মাও-যুগের চীনা মডেল থেকে তাদের তফাত হয়েছে বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টরের বদলে নয়া -উদারনীতি কবলিত ভারতে বিদেশী ও দেশী কর্পোরেট পুঁজির মধ্যবর্তিতায় একটি রাজ্যে শিল্পায়নের স্বপ্নদর্শনে। দুটো পরিস্থিতির মধ্যে বিপুল ফারাক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সাহস, সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্খায় দুস্তর ব্যবধান। 

কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় বা আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের কায়দায় কলোনি থেকে লুন্ঠিত-পুঞ্জিভূত পুঁজির অভাব,  দেশী-বিদেশী ফিনান্স পুঁজি ও শিল্প পুঁজির পলায়ন ইত্যাদি কারণে অভ্যন্তরীণ পুঁজির অপ্রতুলতা নিজস্ব পথে শিল্পায়নে বড় বাধা হয়ে ওঠে। বিপ্লবী সোভিয়েত, চিনে, কিউবায় বেসরকারী পুঁজির রাষ্ট্রায়ত্তকরণ বা বাজেয়াপ্তকরণ ( ভারতে বা ভঙ্গ বঙ্গে যা  সিপিএমের ভাবনার অতীত) করেও সমস্যার সুরাহা হয়নি। কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত পুঁজির সংস্থানে কৃষকদের উপর নানা জবরদস্তিমূলক ও অংশীদারীভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং তা নিয়ে বামপন্থীদের মধ্যে বিতন্ডার ইতিহাস আমরা জানি। কিন্তু কালক্রমে পর্বভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রবিপ্লবের নীল নকশাটির অনুসারী শিল্পসভ্যতার অনিবার্যতা ও প্রগতিশীলতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে বামপন্থী মহলেও। সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি তথা উৎপাদন ও বন্টনব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সংগঠনের সঙ্গে এহেন প্রকৃতি ও প্রাকৃতজীবন ধ্বংসকারী শিল্পায়ন-নগরায়নের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক অস্বীকারের প্রবনতা আজ দেশে দেশে পল্লবিত। পুঁজিপতিবৃন্দ ও তাদের দলগুলির বদলে শ্রমিকশ্রেণী ও তাদের প্রতিনিধিত্বের দাবিদাররা রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেই উদ্বৃত্ত মনুষ্যশ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণকারী ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির মৌল চরিত্র বদলে যাবে, এমন কষ্টকল্পনায় বিভোর হয়ে বিংশ শতকের অভিজ্ঞতাজারিত  ইতিহাসবোধকে  ভুলে থাকা বহু বিবেকী বামপন্থীর পক্ষেই আর সম্ভব নয়।  কিন্তু বিকল্প বামপন্থী শিল্পভাবনা, যা বিকল্প সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজভাবনারই অংশ হয়ে ওঠা জরুরি, তা অধিকাংশের কাছে সংশয় ও আকাঙ্খার আলোছায়ায় ঘেরা, খন্ডিত তথ্য ও তত্ত্বে সামগ্রিকতাহীন। তুলনায় সিপিএম ও সিপিএম বিরোধী দুই শিবিরেই বিকাশ, প্রগতি ও উন্নয়নের প্রাচীন প্রতর্কে বিশ্বাসীদের সংশয়ে বিনিদ্র রজনী যাপনের সমস্যা নেই। ফলে তাদের গলার জোর বেশি। দুই শিবিরের তফাত শুধু এটাই যে একদল আশু বাস্তবতা বা বেকার যুবকদের  রুটিরুজির বন্দোবস্তে দায়িত্ববোধের দোহাই দিচ্ছেন, অপর দল রাষ্ট্রক্ষমতায় বদল পর্যন্ত সে দায়িত্ব মুলতুবি রাখছেন। কিন্তু এতে যে চিঁড়ে ভিজছে না, তা তো  দু তরফের প্রতি জনমতেই প্রতিফলিত।

একই ভাবে বামপন্থীদের গণতন্ত্র বা মানবাধিকার ভাবনার খন্ডিত রূপ, অজস্র দ্বিচারিতা  নিয়ে বাম মহলের ভিতরে-বাইরে যে সব অভিযোগ বিস্তৃত, তা শুধু সিপিএমের দাদাগিরির সমালোচনায় শেষ হয়ে যায় না। তাত্ত্বিক ও ফলিত সমাজতন্ত্রের প্রধান গুরুকুল গুলিতে যে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক আধিপত্যবাদ, শ্রমিক-কৃষকের নামে পার্টির একনায়কত্ব, তথা দলীয় শৃঙ্খলার নামে বৌদ্ধিক ও ব্যবহারিক জীবনে শৃঙ্খল পড়ানোর শিক্ষা এতকাল গুঞ্জরিত, তার প্রতিধ্বনি ভঙ্গবঙ্গে সিপিএমের নেতৃত্বে অচলায়তনের সাধনায় উচ্চারিত মন্ত্রগুলিতে কতদূর, সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এককথায়, সিপি এমের পাপ গোপনে, জেনে বা না জেনে আমরাও কতটা বহন করছি এবং তা থেকে মুক্তির উপায় না খুঁজে বামপন্থার উজ্জল ঐতিহ্যের উদ্ধার এদেশে বা রাজ্যে সম্ভব নয়।        

Mar 11 2015


Biswajit Roy may be contacted at [email protected]

Your Comment if any