banner
left-barhomeaboutpast-issuesarchiveright-bar

 

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হিংসা ও নেপথ্যের রাজনীতি: আলোচনার কিছু বিন্দু

মুখ্য আলোচকঃ বিশ্বজিৎ রায়

পিপলস স্টাডি সার্কেল আয়োজিত আলোচনা, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭

People's Study Circle·Tuesday, 28 November 2017

বক্তার প্রস্তুত করা ক্লাসনোটস এর কিছু পয়েন্টস-
১) ২০১৪ কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলের পর্ব থেকে রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের লক্ষ্যে বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী সাফল্যের শুরু
পরিকল্পনার মূল দুই কেন্দ্র— ক) মুসলমান-প্রধান মূলত বাংলাভাষী সীমান্ত অঞ্চল, যেমন কালিয়াচক, বাদুড়িয়া-বসিরহাট। খ) হিন্দি-বাংলা-ঊর্দুভাষীদের মিশ্র বসতির শিল্পাঞ্চল, যেমন ধুলাগড়-হাজিনগর-চন্দননগর-খড়্গপুর। সাম্প্রদায়িক হিংসা ঘটছে মূলত এই দুই অঞ্চলেই। সীমান্তে সক্রিয় আরএসএস, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, হিন্দু সংহতি ইত্যাদি। শিল্পাঞ্চলে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা ইত্যাদি। মেয়েদের মধ্যে সক্রিয় দুর্গা বাহিনী। সাংগঠনিক ধাঁচায়, বিশেষত সঙ্ঘের গোপনীয়তা। বিশেষ নজর ছাত্র-যুবকদের দিকে। দুই জায়গাতেই রাজ্যে মমতার রাজত্বে মুসলমানরা আগ্রাসী এবং হিন্দুরা আক্রান্ত বলে প্রচার। হিন্দু রক্ষায় বিজেপিকে ক্ষমতার আনার পক্ষে প্রচারের পাশাপাশি দল নির্বিশেষে স্থানীয় হিন্দু নেতাদের মধ্যে সঙ্ঘের প্রভাব বৃদ্ধি।

ক) সীমান্ত অঞ্চল: হিন্দু ভোট একজোট করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে মুসলমান অনুপ্রবেশের জেরে হিন্দুদের সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার জিগির। বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর ধর্মীয়-যৌন অত্যাচার নিয়ে ধারাবাহিক প্রচার। এর প্রধান শিকার বলে ‘বাঙ্গাল’ নমঃশূদ্র ও পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় ইত্যাদি দলিত ও তপশিলি সম্প্রদায়ের মানুষকে মুসলমান-বিরোধিতায় ব্যবহার। হিন্দুদের শরণার্থী হিসাবে আমন্ত্রণ এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও তপশিলি হিসাবে সুযোগ-সুবিধা প্রদানের খুড়োর কল ঝোলানো। ক্রমশ সীমিত চাষ-বাস্তুজমি, মজে যাওয়া খাল-বিল-পুকুরের জমি, পঞ্চায়েত ও চাকরি স্তরে সরকারি সুযোগসুবিধে নিয়ে গরিব মানুষের মধ্যে টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক ঘোঁট। উদাহরণ- বাদুড়িয়া-বসিরহাট, নাকাশিপাড়া। মন্দির-ধর্মসভার সঙ্গে সঙ্ঘ শাখার সংখ্যা ও প্রভাববৃদ্ধি। সঙ্ঘী সনাতন হিন্দুত্বের প্রচারের পাশাপাশি স্থানীয় নিম্নবর্ণীয়/বর্গীয় গৌণধর্ম ও মিশ্র সংস্কৃতির বিরোধিতা। দল নির্বিশেষে হিন্দু নেতা-মাস্তান-চোরাচালানকারীদের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

) শিল্পাঞ্চল: দুর্বল ও শতধাবিভক্ত শ্রমিক আন্দোলনের জেরে ধর্মীয় বিভাজনের চিহ্ন ঘিঞ্জি, জন্মবহুল এলাকায় বন্ধ কলকারখানার জমি-বাড়ির দখল ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসা তথা সিন্ডিকেট-মাস্তান-রাজনৈতিক দাদা-পুলিশ চক্রগুলির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িকীকরণ। হিন্দিভাষী অভিবাসী ছোট ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকদের মধ্যে রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী, শস্ত্রপূজা ইত্যাদির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, দৈনিক লাঠি-তলোয়ার খেলা, ভাগোয়া ঝাণ্ডা (গেরুয়া ধ্বজ) প্রণাম, গঙ্গা-আরতি, ভজন-সন্ধ্যা ইত্যাদি সঙ্ঘী কার্যক্রমের ব্যাপক বিস্তার। বাঙালিপ্রধান দুর্গাপূজার উত্তর ভারতীয় উৎসস্বরূপ হিন্দুত্বের ধর্মীয় আচারে জোর। ‘ভিতু’ বাঙালিদের গো–বলয়ের হিন্দু ‘পৌরুষে’ প্রত্যয় জাগাতে নানা মিলিত কর্মসূচি। স্থানীয় মিশ্র সংস্কৃতির কেন্দ্র বা প্রতীকগুলি তথা ঐতিহ্যের অবহেলা ও অবমাননা। ঈদ-মহরম–নবীদিবসে মুসলমান প্রধান অঞ্চলে গরু কাটা ও মাংস খাওয়া ও তার বাইরে সশস্ত্র মিছিলের রুট বাড়ানো, মসজিদে মাইক বাজানো এবং ক্রিকেট খেলা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানকে সমর্থন ইত্যাদি ইস্যুতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পারদ চড়ানো। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের পালে হাওয়া। আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়ার প্রেক্ষাপটে খ্রিষ্টীয়–জায়নবাদীদের সঙ্গে মোদী ও সঙ্ঘের নৈকট্যের সমর্থনে সভা-সমাবেশ। ইসলামের পতাকা এবং পাকিস্তানের পতাকায় মিলকে ব্যবহার করে নবীদিবসে মুসলমানদের পাকিস্তানি দালাল বলে ব্যাপক প্রচারে হিন্দু নারী-পুরুষের মধ্যে প্রভাব বৃদ্ধি। দল নির্বিশেষে হিন্দু নেতা–এলাকার দাদাদের সঙ্ঘী মতাদর্শে প্রাণিত করা যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তারা হিন্দু বীরের ভূমিকা নিতে পারে। এই কাজে হিন্দিভাষীদের মধ্যে সঙ্ঘ বেশি সফল। অন্যদিকে হিন্দু সংহতি ছেচল্লিশের বাঙ্গালি হিন্দু মহল্লার রক্ষাকর্তাদের নজির প্রচার করছে। উদাহরণ- ধুলাগড় থেকে খড়গপুর।

২) সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে তৃণমূল সরকার ও দলের ভূমিকা
ক) বাম-কংগ্রেসের সাথে সংখ্যালঘুদের ভোটের বিভাজনের সম্ভাবনা রুখতে সম্প্রদায়ের রক্ষাকর্তা হিসাবে মমতা সরকার ও দলের মৌরসিপাট্টা লাভের লক্ষ্যে ধর্মীয়-সামাজিক রক্ষণশীল নেতাদের তোষণ ও ব্যবহার। উদাহরণঃ বরকতিকে তোল্লাই/ মন্ত্রী-বিধায়ক-সাংসদদের মধ্যে এহেন লোকেদের সংখ্যাবৃদ্ধি/ তিন তালাক প্রশ্নে মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডকে সমর্থন। খ) গত দু’বছর দুর্গা পুজার বিসর্জন ও মহরম এক সঙ্গে পড়ায় সরকারের নীতিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সুযোগ বৃদ্ধি। গত বছর বিসর্জন-মহরমের মিছিলকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে দশটি ছোট-বড় সংঘাত। ভোটের হিসাব মাথায় রেখে মহরম-নবী দিবসের মিছিলের এলাকা বাড়ানোকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসক দলের গোষ্ঠী-কোন্দলের প্রভাব। উদাহরণ, হাজিনগর, চন্দননগর, ধুলাগড়, মুর্শিদাবাদ। গ) সরকারবিরোধী আন্দোলন-দল-সংগঠনের বিরুদ্ধে পুলিশি নির্মমতায় ছেদ না পড়লেও (যেমন ভাঙরে আলমগীর ও মফিজুলকে গুলি করে হত্যা) সাম্প্রদায়িক সমাবেশ ও হিংসার প্রতি সহিষ্ণুতা। ধর্মীয় সংঘাত বাড়লেও সরকারের তরফে অস্বীকার। ধুলাগড় ও বসিরহাটের পর হিন্দুত্ববাদীদের প্ররোচনায় পা দেওয়ার জন্য দলীয় বিধায়ক ও মুসলিম কট্টরপন্থীদের মুখ্যমন্ত্রী তিরস্কার করলেও পরে তা অস্বীকার। ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক প্রচারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার কথা বললেও সরকারের সেকুলার সমালোচকদের পুলিশি হয়রানি ও গ্রেফতারি। স্থানীয় শান্তি উদ্যোগগুলিতে শাসক দলের মৌরসিপাট্টা, স্বাধীন উদ্যোগে বাধা।

৩) মুসলমান কট্টরপন্থীদের প্রভাববৃদ্ধি
ইউরোপ-আমেরিকায় ইসলামোফোবিয়া ও প্রতিক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের উপর দেশ জুড়ে হিন্দুত্ববাদী আক্রমণে ইসলামিক মৌলবাদীদের প্রভাব এখানেও বাড়ছে। স্থানীয় স্তরে জাতীয় ও রাজ্যভিত্তিক মুসলিম রক্ষণশীল সংগঠন/গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের প্রতি সরকারি ও শাসক দলের প্রশ্রয়। বিশেষ করে অভিবাসী মুসলিম শ্রমিক যুবকদের মধ্যে ক্রোধ ও আতঙ্কের বিস্তারকে ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে শক্তি প্রদর্শনের লড়াই। মমতার পুলিশ-প্রশাসন আক্রমণাত্মক হবে না জেনে ইসলামের রক্ষাকর্তাদের আগ্রাসী সমাবেশ, রাস্তা অবরোধ এবং থানা আক্রমণ। কালিয়াচক, বাদুড়িয়া-বসিরহাট। হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় জলসাকে ব্যবহার করে সম্প্রদায়ের মধ্যে অবরুদ্ধ মানসিকতা বাড়ানো এবং ইসলামের অস্তিত্বনাশের গ্লোবাল ষড়যন্ত্র নিয়ে উচ্চকিত প্রচার। মসজিদে মাইক বাজানো, মহরম-নবীদিবস ইত্যাদি উপলক্ষে সশস্ত্র মিছিলের রুট বাড়ানো ইত্যাদি নিয়ে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক মহলের সঙ্গে দরাদরি। স্থানীয় অপরাধী-চোরাচালানকারীদের মধ্যে ‘কওমের রখওয়ালা’দের প্রভাব বৃদ্ধি। বাংলা তথা উপমহাদেশের উদারপন্থী, মিশ্র সুফি-ভক্তি ধারার ধর্মীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যে বিশ্বাসের বদলে ওয়াহাবি-সালাফি মৌলবাদের প্রচার ও প্রভাব বৃদ্ধি। নিম্নবর্ণীয় ও বর্গীয় ফকির-আউল-বেশরাদের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি জামাত-এ-ইসলামির সমর্থনে সভা-সমাবেশ/প্যালেস্টাইন থেকে রোহিঙ্গাদের জাতীয় স্বাধীনতা, নাগরিক ও মানবাধিকারের প্রশ্নটিকে শুধুই সাম্প্রদায়িক ইস্যু হিসাবে দেখানো ইত্যাদি।

৪) দাঙ্গাবাজদের উস্কানি, প্রচার ও সমাবেশ-সংগঠনের নতুন অস্ত্রঃ স্যোসাল মিডিয়া/ স্মার্টফোন;
নতুন বার্তাবাহকঃ ছাত্র-যুবক
হিন্দু-মুসলমান দুই তরফেই রাস্তার সমাবেশ ঘটাতে ফেসবুক/হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করা হলেও ডিজিট্যাল উস্কানি মূলত হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের। হিন্দু প্রচারে জাতীয় বা উপমহাদেশীয় ঘটনা ও ইতিহাস প্রধান হলেও মুসলিম প্রচারে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় দুই ঘটনা ও ইতিহাসই গুরুত্ব পাচ্ছে।

উদাহরণঃ কালিয়াচক, ইলামবাজার, বাদুড়িয়া-বসিরহাট। পাড়ার ক্লাব, ব্যায়ামাগার ইত্যাদির ব্যবহার। ছেচল্লিশের দাঙ্গা থেকে ধুলাগড়, হাজিনগর, চন্দননগর, বাদুড়িয়া-বসিরহাট। নন-ডিজিট্যাল ঘৃণার প্রচার স্কুল স্তরেওঃ নাকাশিপাড়া ও নদীয়ার অন্যত্র। মেয়েদের মধ্যেও সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রভাব বাড়ছে।

৫) সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী দলগুলি ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
দেশভাগ পর্বে দাঙ্গাবাজদের মোকাবিলায় শ্রেণীচেতনা ও মিশ্র সংস্কৃতিঋদ্ধ বামেদের গৌরবময় ভূমিকা আজ অনুপস্থিত। ১৯৯২-২০০২ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের পর্বেই ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টের মধ্যে ভোট-রাজনীতি ও শ্রেণী-রাজনীতির দোলাচল স্পষ্ট হয়। ক্ষমতাচ্যুত ও হীনবল বামফ্রন্টের নেতা-কর্মীরা সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হিংসা প্রতিরোধে পথে নামেননি। আদর্শগত দৃঢ়তার অভাব ও তৃণমূল বিপাকে পড়ায় আনন্দ। এত ঘটনার পরও উপদ্রুত ও উত্তেজনাপ্রবণ এলাকাগুলিতে এবং রাজ্যব্যাপী সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী লাগাতার কার্যক্রম নেই। মালদা-দিনাজপুর-মুর্শিদাবাদের মতো কংগ্রেসের পুরনো ঘাঁটিতেও বিজেপি-তৃণমূলের বিস্তার। শাসক ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে বিভক্ত বুদ্ধিজীবীকুল ও বৃহত্তর নাগরিক সমাজের তরফেও কোনও ধারাবাহিক কর্মসূচি নেই। ছোট বাম দল ও গোষ্ঠীগুলির সীমিত ক্ষমতা ও উদ্যোগের শতধা বিভক্তির জেরে প্রভাব দুর্বল।

৬) ফলস্বরূপ সামাজিক পরিস্থিতি
কোনও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মতো প্রভাবশালী শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন নেই। হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সাম্প্রদায়িকতা ও ইসলামোফোবিয়া বেড়েছে। উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্ত দু’দিক থেকেই কোণঠাসা। রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগের অভাবে উপদ্রুত এলাকাগুলিতে দমচাপা পরিবেশ, অবিশ্বাস ও আতঙ্কের জেরে ঘেটোয়াইজেশন বাড়ছে। সামান্য ইন্ধনেই ফের আগুন জ্বলার আশঙ্কা। হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের ‘গুজরাত-ইউপির মতো উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার সঙ্ঘী প্রচার জমি পাচ্ছে। মুসলমানদের মধ্যে অবরুদ্ধ মানসিকতা, নিরাপত্তাহীনতা থেকে আত্মরক্ষার প্রস্তুতির পক্ষে প্রচারও। শান্তি–সহিষ্ণুতা সবল-প্রবলের পক্ষে শোভা পায় এই মানসিকতা বাড়ায় সব রকম সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির পক্ষে পরিস্থিতি অনুকূল।

৭) প্রতিরোধের শক্তিগুলি
তুলনায় কম হলেও দাঙ্গাপীড়িত এলাকাগুলিতে দুই সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের মধ্যে প্রতিবেশি ভিন ধর্মের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক দায়বোধ, দাঙ্গার জন্য অনুশোচনা দেখা গেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয়-সামাজিক নেতাদের কেউ কেউ সম্প্রদায়ের ভিতরে সঙ্ঘী ফাঁদে পা দেওয়ার বিরুদ্ধে মুসলিম কট্টরপন্থীদের সতর্ক করলেও সঙ্ঘ-বিরোধী হিন্দু সংগঠনের কণ্ঠস্বর বিশেষ শোনা যাচ্ছে না।

প্রতিরোধের অনেকান্ত পথ: মুক্তি-যুক্তি-ভক্তির মিলিত শক্তি। আমজনতার জীবন-জীবিকার বারোমাস্যা নিয়ে শ্রেণী ও গণ আন্দোলন ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতিষেধক। উদাহরণ ভাঙর আন্দোলন। মুসলমানপ্রধান এলাকায় পাওয়ার গ্রিড-বিরোধী আন্দোলনের মিলিত নেতৃত্বে জন্মসূত্রে হিন্দু বামপন্থীরাও আছেন। বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস বলে এটাই একমাত্র পথ নয়। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-লিঙ্গ-ভাষা-অঞ্চল ইত্যাদি নানা আত্মপরিচয় ও তাকে ঘিরে যূথচেতনার ধংসাত্মক বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে লড়াইতে মুক্তির রাজনীতি তথা অর্থনৈতিক ও সামাজিক গণতন্ত্র, নাগরিক ও মানবাধিকারের আদর্শ এবং যুক্তিবাদী ভাবনার প্রচার জরুরি। তার সাথে চাই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অভিভাবক ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ভক্তি আন্দোলনের ধারায় মিশ্র লোকসংস্কৃতির স্থানীয় ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যগুলির দিকে ফেরা, আধিপত্যবাদী ধর্মীয় মিথের প্রতিস্পর্ধী বয়ানের জনপ্রিয়করণ, প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বহুত্ববাদী ধ্যানধারণার চাপাপড়া ইতিহাসের পুনরুদ্ধার ইত্যাদি।

সাংগঠনিক রূপ: দাঙ্গার তদন্ত এবং দাঙ্গাবাজদের মুখোশ উন্মোচনে সমন্বয়। ফিজিক্যাল ও ডিজিট্যাল স্তরে সমমনস্ক কর্মীদের নেটওয়ার্ক। আন্তঃসাম্প্রদায়িক জানা-বোঝার জন্য নিয়মিত আলোচনা। দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলায় ছাত্র-যুবকদের কেন্দ্র করে স্থানীয় স্তরে উদ্যোগ ইত্যাদি।

Nov 29, 2017


Biswajit Roy [email protected]

Your Comment if any